যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের বিপরীতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে উপসাগরীয় দেশ দুবাই। বিশে^র ধনবানদের পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করা, কর রেয়াত, আনন্দভোগের কেন্দ্র হিসেবে দুবাই নিরাপদ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেই নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে ইরান। এতে করে পুঁজি বিনিয়োগের হোতাদের টনক নড়েছে। তারা ভাবছে, এখন তাদের সম্পদ আর নিরাপদ নয়। এই নিরাপত্তাহীনতা বিশে^র ধনীদের তেমনভাবে নাড়া না দিলেও, এশিয়ান পুঁজিপতিদের শঙ্কিত করেছে। ভারতীয় দুই পুঁজিপতি, তাদের সম্পদ সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করেছে। অন্যরাও হয়তো সেই স্থানান্তরের মধ্যে আছে। দুবাইয়ে বিনিয়োগকারী চীনারা কি উদ্বেগে আক্রান্ত? সেটা বোঝা না গেলেও, শঙ্কা বাড়বেই যদি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে এবং ইরানি মিসাইল উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিনি স্থাপনায় আঘাত হানতে থাকে, তাহলে দুবাইও বাদ পড়বে না।
নিরাপত্তা পুঁজির প্রথম শর্ত। সেই শর্ত বিঘিœত হলে, পুঁজির পাখা গজায়। সে উড়াল দিতে চায় নিরাপদ দেশে। স্থিতিশীল অর্থনীতির পরিবেশে বিনিয়োগ হতে চায়। এ কারণে যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিস্থাপক হলে সেখানেই পুঁজি ছোটে। দুবাই ছিল সেই স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক মহানগর, যেখানে পুঁজির স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল যার পরিমাণ দেড় ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইউরোপ-আমেরিকান পুঁজিপতিদের পাশে আছে এশিয়ান পুঁজিও। বিশেষ করে চীনাদের একটি বড় অংশ, তাদের সম্পদ দুবাইয়ে বিনিয়োগ করেছিল নিরাপত্তার নিরিখে। ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, মালয়েশিয়ান কিংবা ব্রুনেই দারুসসালাম, জাপানি বিনিয়োগ তো সেখানে কমবেশি আছেই। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে বয়ে চলা যুদ্ধের তা-ব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার ওপর নির্ভর করবে পুঁজি স্থানান্তরের বিষয়টি। এই শঙ্কা নিয়ে আমরাও ভাবিত। কারণ আমাদের ধনপতিদের পুঁজি, পাচার করেই হোক বা আইনানুগ বিনিয়োগের মাধ্যমেই হোক, দুবাই হলো তার একমাত্র সহজ ও সুন্দর পথ। কারণ সেখানে টাকার উৎসের কোনো প্রশ্ন নেই। সব রকমের টাকাই সেখানে বৈধ। কর দেওয়ার বালাই নেই বললেই চলে। ভোগবিলাসের অপরিমিত উৎস থাকায়, বাংলাদেশের অনেক ধনপতি সেখানে যান। সঙ্গে যায় অবৈধ সম্পদ। লুটেরা সম্পদও যোগ দেয় সেই ভোগবিলাসের উৎসবে।
বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। তবু অবৈধ সম্পদ লুটেরারা বিনিয়োগ করে বিদেশের বিভিন্ন শহরে গাড়ি, বাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এখন আমাদের লুট হওয়া পুঁজি সিঙ্গাপুর, দুবাই, লন্ডন, হংকং, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক, লসঅ্যাঞ্জেলেস, কানাডার টরন্টোতেই বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। টরন্টোতে গড়ে উঠেছে বেগমপাড়া, যাদের স্বামীরা প্রশাসনে উচ্চ স্তরের চাকরিজীবী। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়েছে ৩-৪শ মানুষ, যাদের বৈধ-অবৈধ বিনিয়োগ আছে। এই যে সম্পদ পাচার হয়ে যাওয়া, তা আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। ওই অবৈধ টাকা যদি দেশেই বিনিয়োগ হতো, তাহলে কিন্তু দেশে শক্তিশালী অর্থনীতি পাওয়া যেত। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও সরকার রয়েছে। সরকার নতুন হলেও তার পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে, শিল্প খাতে নতুন প্রণোদনা পাচ্ছে মানুষ। সব খাতেই যদি বৈধ পুঁজির পাশে চোরাই বা অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকে, তাহলে অর্থ পাচারের প্রশ্নটি আর থাকবে না। বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ। আমরা মনে করতে চাই যে, এশিয়ান পুঁজি যেন দুবাই থেকে ঢাকায় আসে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প থেকে শুরু করে, প্রযুক্তি, কৃষি, সড়ক ও রেলওয়ে যোগাযোগ খাতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারের বিনিয়োগ কর্র্তৃপক্ষ যদি দুবাইয়ের
স্থানান্তরিত পুঁজির একটি অংশও দেশে আনতে পারে, তাহলে আমাদের কর্মজীবনের গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। আর তা হবে ইতিবাচক প্রবাহ। আমরা দেশের প্রান্তিক জনশক্তিকে শিক্ষিত, যোগ্য, দক্ষ ও কর্মমুখর করতে চাই।