বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন ২৫ বছরের যুবক সাদিক (ছদ্মনাম)। তিনি প্রায়ই বলতেন, 'সবকিছু ছেড়ে দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে', 'আমি সবাইকে হতাশ করেছি'। বাইরে থেকে তাকে সবসময় স্বাভাবিক মনে হতো। যে কারণে বন্ধু ও কাছের স্বজনরা এটাকে সাদিকের সাধারণ হতাশা ভেবেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সাদিক সকলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। নিজের ব্যবহৃত প্রিয় জিনিসগুলো অন্যদের গিফট করে দিতে থাকে। সবার অগোচরে একদিন সকালে সবাই তার আত্মহত্যার খবর জানতে পারে।
সাদিকের অস্বাভাবিক আত্মহননের পর তার পরিবার জানায়, সাদিক কখনো সরাসরি কারো সাহায্য চায়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবারের দায়িত্ব ছিল সাদিকের কাঁধে। এর মধ্যে ছিল চাকরির অনিশ্চয়তা। পরিবারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট ও চাকরির অনিশ্চয়তায় দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ তাকে ভেতরে ভেতরে হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। তার হতাশার কথাগুলো ছিল আত্মহত্যার পরোক্ষ সংকেত। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি।
আত্মহত্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যা বর্তমানে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আত্মহত্যা এখন এক নীরব মহামারির নাম। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আত্মহত্যার হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
গত ১০ বছরের আত্মহত্যার চিত্র যদি দেখা যায়, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৫শ জন, ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৮শ, ২০১৭ সালে ১১ হাজার, ২০১৮তে ১১ হাজার ৫শ, ২০১৯ সালে ১২ হাজার, ২০২০ সালে এক হাজার বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে ১৩ হাজার ৫শ, ২০২২ সালে ১৪ হাজার ২শ জন, ২০২৩ সালে প্রায় ১৪ হাজার ৮শ জন, ২০২৪ সালে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। গত কয়েক বছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪-২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে হতাশা, একাকীত্ব, সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অসুস্থতা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
বিভিন্ন জরিপের পর গবেষণায় দেখা যায়, মেয়েরা আত্মহত্যার চেষ্টা বেশি করে, কিন্তু ছেলেদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, মেয়েরা আবেগ প্রকাশ বেশি করলেও ছেলেরা অধিক প্রাণঘাতী পদ্ধতি ব্যবহার করে। ছেলেরা সাহায্য চাইতে কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। জরিপ বলছে, নারীদের আত্মহত্যার চেষ্টার ৪ দশমিক ১৭ এবং পুরুষদের ৩.৩৬ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থান সংকট এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী মানসিক চাপ বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অনুযায়ী, পুরুষদের সুইসাইডাল মর্টালিটি রেট ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ও কিশোর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৩ সালে ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে ছেলে ২০৪ জন এবং মেয়ে ৩০৯ জন। ২০২৪ সালের সার্ভেতেও প্রায় ৬১ ভাগ আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থী ছিল মেয়ে। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীর হার বেশি। আত্মহত্যার প্রায় ৭২ শতাংশ ঘটে এই বয়সে। ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই ছিল টিনএজার।
আত্মহত্যার প্রচেষ্টা থেকে ফিরে আসা এক নারীর সংগ্রামের উদাহরণ দিচ্ছি। একটি প্রতিষ্ঠিত কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন তৃষা। পরিবার ও সমাজের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, সম্পর্কজনিত মানসিক আঘাত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত তুলনার কারণে ওই কিশোরী ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়। তাকে প্রায়ই বলতে শোনা যেত, 'আমাকে কেউ বুঝে না', 'আমি থাকি বা না থাকি কারও কিছু যায় আসে না'। পরিবার বিষয়গুলোকে 'অতিরিক্ত আবেগ' হিসেবে এড়িয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে তৃষা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। যদিও তাৎক্ষণিক উপযুক্ত চিকিৎসার কল্যাণে তৃষা বেঁচে যায়। নতুন জীবন ফিরে পেয়ে তিনি এখন মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন। চেষ্টা করছেন, তার মতো কেউ ডিপ্রেশনে ভুগে যেন আত্মহত্যার চেষ্টা না করেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে আত্মহত্যার কিছু প্রত্যক্ষ সংকেত। এর মধ্যে বিষণ্ন ব্যক্তির মুখে 'আমি বাঁচতে চাই না', 'মরে গেলে সবাই শান্তি পাবে', আত্মঘাতী উপকরণ সংগ্রহ করা, বারবার মৃত্যু নিয়ে কথা বলা, নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করা। আবার অনেক সময় পরোক্ষ কিংবা খুব সূক্ষ্ম সংকেত যেমন হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন, অতিরিক্ত রাগ বা হতাশা, প্রিয় জিনিস অন্যকে দিয়ে দেওয়া, "সব শেষ" ধরনের কথা বলা, অতিরিক্ত নীরব হয়ে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশামূলক পোস্ট, মাদকাসক্তি বৃদ্ধি, হঠাৎ অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যাওয়া—এসব লক্ষণ কারো মধ্যে পরিলক্ষিত হলে তিনি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে ধরে নিতে হবে।
মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আত্মহত্যা সাধারণত হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, এটি দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণার ফল। অনেকেই আসলে মরতে চায় না, তারা চায় তাদের কষ্ট থেমে যাক। যখন একজন ব্যক্তি মনে করে, 'আমাকে কেউ বোঝে না', 'আমার ভবিষ্যৎ নেই', 'আমি বোঝা হয়ে গেছি', তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যুক্তি না দিয়ে ওই ধরনের ব্যক্তির কথা মন দিয়ে শোনা, তাকে মানসিক ও মানবিক সাপোর্ট দেওয়া, তার কোনো ধরনের দুর্বলতা ধরা উচিত নয়। এছাড়া আত্মহত্যা রোধে নিয়মিত মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলিং, স্কুল-কলেজে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করা, পরিবারের সাথে খোলাখুলি কথা বলা, ক্রাইসিস সাপোর্ট সার্ভিস চালু করা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কেউ যদি সাহায্যের ইঙ্গিত দেয়, সেটিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। একজন মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে, এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত ফল। একমাত্র সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং সময়মতো মানসিক ও মানবিক সহায়তাই পারে একটি জীবন বাঁচাতে।
- লেখক: সিনিয়র সাইকোলজিস্ট এন্ড অ্যাডিকশন প্রফেশনাল, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর, আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়