ক্রেতাখরায় নির্জনতার আবহ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

রমজান মাসে শুরু হওয়া অমর একুশে বইমেলা পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পাবেÑ এমন প্রত্যাশা ছিল প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের। তবে মেলার ১২তম দিনেও সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। নতুন বইয়ের সমাহার আর সাজানো স্টল থাকলেও ক্রেতার অভাবে অনেকটাই নিস্তরঙ্গ ছিল মেলার পরিবেশ। দেখা যায়নি পাঠকদের সেই চিরচেনা ভিড়।

গতকাল সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। ফলে প্রতি বছরের মতো জমজমাট পরিবেশের বদলে মেলার অনেক অংশেই ছিল কিছুটা নির্জনতার আবহ। মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে নতুন বইয়ের সমাহার থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় বিক্রিতে তেমন গতি দেখা যায়নি। অনেক প্রকাশকই দিনের বেশিরভাগ সময় পাঠকের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে ইফতারের পর দর্শনার্থীর উপস্থিতি বাড়তে দেখা যায়।

এ বছর বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক মানসম্মত এবং দেশের খ্যাতিমান লেখকের বই প্রকাশ করেছে। তবে মেলা ক্রেতাশূন্য হওয়ায় এসব বই পাঠকদের তেমনভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি। অনেকেই মেলায় এসে বই দেখছেন, স্টলে ঘুরছেন কিন্তু তেমন একটা বই কিনছেন না। অনেক স্টলে বসে বসে সময় পার করতে দেখা গেছে বিক্রেতাদের।

বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মেলার ১২তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৬৩টি। এ নিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৬টি। গতকাল মেলা ২টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়।

এ বছর আগামী প্রকাশনী এনেছে বিচারপতি মুহাম্মদ আবু হাসান আলীর হাজার গীতিকবিতা প্রথম থেকে চতুর্থ খ-, রায়ান-একাত্তর-চল্লিশ। তমাল প্রকাশন এনেছে এক এক করে সবুজ ঘাস, শফিক মজিদ সম্পাদিত রোহিঙ্গা ডায়েরি দ্বিতীয় খন্ড, ছুটির রং বন্ধু, রুমানা আবদুল হাইয়ের জার্নাল, আবিদ আনোয়ারের স্বপ্নকথার শেষ রজনী।

দেশ পাবলিশিং এনেছে ‘সিঙ্গেলসে সেকেন্ড’, ‘খতিবের কণ্ঠের তত্তুদ্দীন আহমদ : কন্যার চোখে’, ‘পুত্রের চোখে’ এবং মালালা ইউসুফজাই সম্পাদিত ‘অনুসন্ধান নজরুল’।

প্রথমা এনেছে আবুল বাসারের অনুবাদে কালো রোদের, সন্জিদা খাতুনের ‘আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন’, মাহিদুল আলমের ‘আমাদের আনন্দ আর আমার বেদনা’, কবিতা বুয়ানের ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী’, তৌফিকুল ইসলাম পারভেজের ‘পাকিস্তান আন্দোলন’, সুলতানা আবদুল হাইয়ের ‘শেকসপিয়ারের আর্ট কোম্পানি’ এবং কুমার ফাহিমানের সংকলনে ফিলিস্তিনবিষয়ক অর্থনৈতিক বই।

কথাপ্রকাশ থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘প্রেম ও প্রার্থনায়’, প্রথমা থেকে মহিউদ্দিন আহমদের ‘ঢাকায় জিন্না’, ঝুমঝুমি থেকে ঝর্না রহমানের ‘দখিনমুখি ঘর’ মেলায় এসেছ।

বাতিঘর এনেছে জুর্গেন হাবারমাসের বই ‘বই বিক্রেতা : উপন্যাসের দুঃখজনকতা ও জীবন্ততা’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রম্য সমাজ ও গল্পের দায়’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমগ্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাসুলি বাঁকের উপকথা’। এ ছাড়া বদরুল আলম খানের ‘উনিশ শতকের বাঙালি’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছড়াগল্প ও বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থসহ আরও নানা ধরনের বই রয়েছে।

মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, আজ মেলায় ভিড় তুলনামূলক কম ছিল। তাই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে স্টল ঘুরে বই দেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে মানুষ একটু বেশি হলে মেলার পরিবেশটা আরও প্রাণবন্ত লাগত।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ বছর ক্রেতা কম থাকায় বিক্রিও খুব একটা হয়নি। আমরা আশা করেছিলাম ছুটির দিনগুলোতে পাঠকের উপস্থিতি বাড়বে এবং বিক্রিও ভালো হবে, তবে এবার তাও হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকাশক জানান, বইমেলা নিয়ে সবার আপত্তি ছিল। তবুও রমজানে মেলা আয়োজন করা হয়েছে। এর আগেও আমরা সুফল পাইনি। অনেক মানসম্মত বই আসলেও ক্রেতার অভাবে তা পাঠকদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

গতকাল বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শহীদুল্লা কায়সার শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।

শিবলী আজাদ বলেন, রোজনামচা, ভ্রমণকাহিনি ও উপন্যাস মিলিয়ে নয়টি পূর্ণাঙ্গ ও একটি অসমাপ্ত গ্রন্থের লেখক শহীদুল্লা কায়সার মূলত একজন প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক হিসেবেই বেশি পরিচিত। সংশপ্তক উপন্যাসের প্রকাশ তার ঔপন্যাসিক সক্ষমতার ধারণা দৃঢ় করেছে, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিকের অধিষ্ঠান দিয়েছে। পূর্ববাংলায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক ভাঙচুর, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের চিহ্ন শহীদুল্লা কায়সারের সাহিত্যে উঠে এসেছে।

বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি ড. নাঈমা খানম এবং সেলিনা আক্তার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন প্রদীপ মিত্র, সৈয়দ রনো, মাহিনুর মুমু, মো. এনামুল হক ও ইকবাল আলী। সংগীত পরিবেশন করেন আশরাফ মাহমুদ, সনৎকুমার বিশ্বাস, জাবীর ইমাম খান, এটিএম আশরাফ হোসেন, জামাল দেওয়ান, আশরাফুজ্জামান, মফিজুর রহমান, মো. ওবায়দুর রহমান, সুমন চন্দ্র দাস এবং আহমেদ শাকিল হাসমী।

আজকের সময়সূচি : আজ ১০ মার্চ মঙ্গলবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেবেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করবেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত