সীতাকুণ্ডে ছাত্রীদের ‘ইয়াবা’ সেবনের খবর, অনুসন্ধানে মিলল ভিন্ন তথ্য

‌‌‘ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো শিক্ষার্থী জড়িত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাফরনগর অর্পণা চরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রী ইয়াবা সেবন করে অসুস্থ হয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে অনুসন্ধানে ইয়াবা সেবনের কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটি মূলত ঘুমের ওষুধ সেবনকে কেন্দ্র করে।

বিদ্যালয়ের লিখিত বিবৃতি অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিষয়টি শিক্ষকের নজরে এলে তাকে প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে সে ‘সেডিল’ নামের ঘুমের ওষুধ সেবনের কথা জানায়। পরে তার কাছ থেকে ওই ওষুধের পাতা উদ্ধার করা হয়। অনুসন্ধানে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একই ওষুধ সেবনের ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক জাহেদ হোসেন জানান, মোট ৬ জন ছাত্রীর ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ ও সেবনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তাদের অভিভাবকদের জানানো হয়। পরে অভিভাবকদের বিদ্যালয়ে ডেকে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথ বলেন, ‘এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সেডিল নামের ঘুমের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। ইয়াবা সেবনের যে খবর ছড়িয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ অসত্য ও অপ্রমাণিত। বিষয়টি ঘুমের ওষুধ সেবনসংক্রান্ত।’

 

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী সাময়িকভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো শিক্ষার্থী জড়িত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ রবিবার শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে ইয়াবা সেবনের কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি। তখন জানতে পারি, ঘটনাটি মূলত ঘুমের ওষুধ সেবনকে কেন্দ্র করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য যাচাই না করে এ ধরনের স্পর্শকাতর খবর ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট এক ছাত্রীর মা নাজমুন নাহার বলেন, ‘আমার মেয়ে সহজ-সরল। সে এসবের কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত নয়। দুই-তিনজন সহপাঠীর পাল্লায় পড়ে ভুল করে কয়েকটি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছে। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে খুব অনুতপ্ত। দিনভর না খেয়ে কান্নাকাটি করছে। আমি মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কিত। এই অপরাধবোধ থেকে সে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে কি না, সেই ভয় হচ্ছে। ভুল কিছু লিখে আমার মেয়ের জীবনটা ধ্বংস করে দেবেন না।’

ওই শিক্ষার্থী জানায়, ‘আমি জানতাম না এগুলো ঘুমের ওষুধ। একজন সহপাঠীর পরামর্শে না জেনে পাঁচটি ওষুধ খেয়ে ফেলি। আমি আর জীবনে এমন কাজ করব না।’

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও ঘটনার বিষয়ে একই তথ্য জানায়। তাদের ভাষ্য, শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদের পর এক শিক্ষার্থীর পোশাকের ভেতর থেকে ওষুধ উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যালয়ের লিখিত বিবৃতিতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘সাতজন শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত’—এমন তথ্যকে সঠিক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।

তবে ঘটনাটি ইয়াবা নয়, ঘুমের ওষুধ সেবনকে কেন্দ্র করে হলেও শিক্ষার্থীদের কাছে এসব ওষুধ কীভাবে পৌঁছাল এবং তারা কেন সেগুলো সেবন করল—এ নিয়ে বিদ্যালয়ের নজরদারি ও অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত