সালমান আলি আগা কি অভিশাপই দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজকে? পবিত্র রমজান মাস চলছে, এমন সময় একজন মুসলমান ভাইয়ের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত আচরণে তার অভিব্যক্তি স্পষ্ট। অথচ ক্রিকেটের নিয়মের বাইরে কিছু করেননি বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক। তারপরও বিতর্ক, উত্তেজনা আর ক্রিকেটের চেতনার ফিরে ফিরে আসা। টাইম আউট কা-ের মতো এখানেও স্পষ্ট দুটো ধারা, একদলের চোখে মিরাজই ঠিক আর অন্য দল ক্রিকেটের চেতনার অনুসারী।
মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলছিল বাংলাদেশ-পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। সাহেবজাদা ফারহান এবং মাজ সাদাকাতের চমৎকার উদ্বোধনী জুটির পর (১০৩) দ্রুতই ৩ উইকেটের পতন পাকিস্তানের। বিনা উইকেটে ১০৩ থেকে ৩ উইকেটে ১২২। সেখান থেকেই মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলি আগা চতুর্থ উইকেটে দলকে চাপমুক্ত করে গড়লেন শতরানের জুটি। যে পাকিস্তান প্রথম ওয়ানডেতে ৩৫ ওভারেই অলআউট হয়েছিল, তাদের রানটা শুক্রবারে ৩০০-এর দিগন্তেই সম্ভাবনা জাগাচ্ছে। মিরাজের বলটা সোজা ব্যাটে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেললেন রিজওয়ান। বলটা গড়িয়ে নন-স্ট্রাইকে থাকা সালমানের পায়ের সামনে, কুড়িয়ে নিতে গেলেন মিরাজ। সেই বলটা কুড়িয়ে ফিরত দিতে চেয়েছিলেন সালমানও। তবে তার আগেই বল কুড়িয়ে সরাসরি থ্রোতে স্টাম্প ভেঙে দেন মিরাজ। সালমান তখন দাগের বাইরে। মিরাজের আবেদনে মাঠের আম্পায়ারও তানভীর আহমেদও হতবাক। তিনি পরিস্থিতির ব্যখ্যা জানতে সাহায্য নিলেন টিভি আম্পায়ার কুমারা ধর্মসেনার। ক্রিকেটের আইনে স্পষ্ট, ব্যাটসম্যানের অবস্থান দাগের বাইরে এবং ফিল্ডারের থ্রোতে ভেঙেছে স্টাম্প, আউট না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। বড় পর্দায় আউটের সংকেত দেখে শাপশাপান্ত করতে করতেই মাঠ ছাড়লেন সালমান। রিজওয়ানও কিছুটা উত্তেজিত, তার সঙ্গে মাঠে কথার লড়াই লিটন দাসের।
ধারাভাষ্যকক্ষে তখন রমিজ রাজা ক্রিকেটের চেতনা নিয়ে বয়ান দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পাকিস্তানের ক্রিকেট সমর্থকরা বিষোদগার উগড়ে দিচ্ছেন। ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে উরজ জাওয়েদ সালমানের শাপশাপান্ত করার ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন ‘এদের জন্য পাকিস্তান (ভারতের বিপক্ষে) ম্যাচ বয়কট করতে চেয়েছিল?’ কেউ কেউ লিখেছেন, ‘এটা টাইমড আউট করানো বাংলাদেশের পক্ষেই সম্ভব।’
সালমানকে আউট করার ভিডিও নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে বিসিবিও, যেখানে বর্ণনায় লেখা হয়েছে মিরাজের ব্রিলিয়ান্ট রানআউট। সেই ভিডিওর নিচে মন্তব্যের ঘরে দুই রকম মন্তব্যই দেখা গেছে। কেউ কেউ, বিশেষ করে ভিনদেশীরা ব্যাপারটাকে দেখছেন ক্রিকেটের চেতনার পরিপন্থী আচরণ হিসেবে। বাংলাদেশের সমর্থকদের মত আবার ভিন্ন, তাদের বেশিরভাগই মন্তব্য চলমান ম্যাচটি কোন প্রীতি ম্যাচ ছিল না বরং আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং বাংলাদেশের জন্য সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলার ম্যাচ। এই পরিস্থিতিতে জয়ের জন্য অধিনায়ককে যে কোনো কৌশলই নিতে হবে।
মাঠে যা হয়েছে, সেটা নিয়মিত দৃশ্য নয়। এসব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতেই প্রয়োজন পড়ে ক্রিকেটের আইনের বই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বিভাগের আম্পায়ারিং বিভাগের একজন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, যা হয়েছে তা আইনত সিদ্ধ তবে ক্রীড়াবিদসুলভ মানসিকতার পরিপন্থী, ‘আইনের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে আউট, কারণ ব্যাটসম্যান দাগের বাইরে ছিল। তবে প্রশ্ন হচ্ছে ব্যপারটা ক্রীড়াবিদসুলভ মানসিকতার প্রদর্শন হয়েছে কি না। আমার মনে হয়ে এখানে ক্রীড়াবিদসুলভ মানসিকতা দেখানো যেত। কারণ সালমান কিন্তু রান নিতে বের হয়নি, সেই চেষ্টাও সে করেনি। সে বরং নিজে বল কুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, সে চাইলে সেটা না করে মিরাজকে সরিয়ে নিজে দাগের ভেতরে ঢুকতে পারত। সেটা সে করেনি। ব্যাপারটা ভুল হয়েছে না শুদ্ধ, সেটা ভাবার জন্য মিরাজের জায়গায় পাকিস্তানের কেউ আর সালমানের জায়গায় বাংলাদেশের কাউকে বসিয়ে ভাবুন। একই ব্যাপার যদি বাংলাদেশের সঙ্গে ঘটত তাহলে কী হতো?’
সালমানের আউটের পরই সব ঝাল মাঠেই ঝাড়তে গিয়ে তেড়েফুঁড়ে ব্যাট করতে গিয়ে একের পর এক উইকেট হারায় পাকিস্তান, তাতে করে ৪৭.৩ ওভারে ২৭৪ রানে অলআউট সালমান আগার দল।
প্রেম ও যুদ্ধে কোনো অন্যায় নেই উক্তিটি জন লাইলের যা পরে আরও অনেকেই নানানভাবে ব্যবহার করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন অনেকটাই বিনা গোলাবারুদের যুদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে যে ঘুড্ডির রাজনীতি দেখা গেল, সালমান-মিরাজের ঘটনাটা সেই ভ্রাতৃত্ববোধকে কিছুটা হলেও হয়তো প্রশ্নবিদ্ধ করল।