মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ফের ভয়ানক ষড়যন্ত্র

  • সিন্ডিকেট নয় বরং ২০২৪ সালে ফরেন ওয়ার্কার ম্যানেজম্যান্ট প্লানের আওতায় সব থেকেই শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখা হয়
  • বৈধ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানো ঠেকাতে তৎপর একাধিক চক্র
  • গণমাধ্যমকেও মিথ্যে তথ্য দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তি  
আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১২ পিএম
প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যখনই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে, তখনই ভয়ানক ষড়যন্ত্র শুরু করেছে দেশি-বিদেশি একাধিক চক্র। শ্রমবাজারকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এবং বৈধ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক অভিবাসন ঠেকাতে সভা-সমাবেশ, বিবৃতি, মানববন্ধন ও ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে চক্রের সদস্যরা। তারা গণমাধ্যমকেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশসহ ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নেয় মালয়েশিয়া। তাদের সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি মালয়েশিয়া সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই ‘সিন্ডিকেট’, ‘চক্র’ ইত্যাদি অজুহাত তুলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ সরকার শর্ত পূরণ করা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি ও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সিসহ মোট ৩৩৮টি এজেন্সিকে লোক পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে, যা যেকোনো সোর্স কান্ট্রির মধ্যে সর্বোচ্চ।

এক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বলেন, ভারত এত বড় দেশ। তাদের দেশ থেকে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলেননি। অন্য সোর্স কান্ট্রিগুলোও এ ধরনের কোনো অভিযোগ তোলেনি। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সম্পর্কিত একজন ব্যবসায়ী জানান, বলা হচ্ছে সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তাদের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। ওই সময় শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্য ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকেও শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখা হয়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের ফরেন ওয়ার্কার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের আওতায় সব দেশ থেকেই শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখে। ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হওয়ার আগে অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিকতর সুরক্ষা ও নিরাপদে বাংলাদেশের শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন। তখন শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখার বিষয়টি সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল।

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, বিগত মেয়াদে ১০০টি লাইসেন্সের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হলেও যতগুলো রিক্রুটিং লাইসেন্স মালিকের শ্রমিক পাঠানোর সক্ষমতা ছিল, তারা সবাই শ্রমিক পাঠিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় যেহেতু শ্রমিকের মজুরি মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় দ্বিগুণ, তাই এখানে চাহিদাও বেশি।

বাংলাদেশের শ্রমিকরা যাতে মালয়েশিয়া বৈধভাবে যেতে না পারেন, সেজন্য দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার রয়েছেন ফখরুল ইসলাম নামে বায়রার সাবেক এক নেতা। তার সঙ্গে বায়রার বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও বায়রার সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রিয়াজুল ইসলামকেও বেশি তৎপর থাকতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তারা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলার অপচেষ্টা করছেন। তাদের মিথ্যাচারের কারণে ইতোপূর্বে তারা হামলার শিকারও হয়েছিলেন।

একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেও মন্দাভাব। ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নতুন সরকার যখন বেকারত্ব দূরীকরণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কাজকে ত্বরান্বিত করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে জনশক্তি রপ্তানি করতে চাইছে, তখনই ফখরুল-রিয়াজুল চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। তারা প্রদেয় উদ্যোগ ও পরিশ্রমকে পণ্ড করার চেষ্টা করছে।’

ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, ওমান এমনকি সিঙ্গাপুরে যেতেও ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা লাগে। অথচ ওই সব দেশের ন্যূনতম মজুরি মালয়েশিয়ার চেয়ে কম। সেই সব দেশ নিয়ে কেউ কথা বলছেন না, সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলছেন না। সব অভিযোগ শুধু মালয়েশিয়াকে ঘিরে।

বায়রার একাধিক সদস্য জানান, মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র নেপাল ও ভারতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা দেশের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। যেখানে সরকার বেকারত্ব দূরীকরণ ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজ করছে, সেখানে এই চক্রটি দেশবিরোধী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

ফখরুল সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, তিনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বিষয়ে সব সময়ই সুবিধাভোগী। বিগত সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্যে ১০ সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী ছিলেন এই ফখরুল ইসলাম। মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাণিজ্যের জন্য বাগিয়ে নিয়েছেন নিজের প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টার। প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। পরে তিনি পরিচয় লুকিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। ১০১ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় তার অন্তত দুটি লাইসেন্স রয়েছে। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও রয়েছে তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টার।

১০১ সিন্ডিকেটভুক্ত ফখরুল ইসলামের বেনামী প্রতিষ্ঠান ছিল ত্রিবেণী ইন্টারন্যাশনাল ও সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানায় অন্য ব্যক্তির নাম থাকলেও নেপথ্যে মালিক ও অংশীদার ফখরুল ইসলাম। তিনি নিজের লাইসেন্স সরাসরি ব্যবহার না করে অন্যের নামে ব্যবসা করছেন। অন্য যারা ব্যবসা করেন তাদের লাইসেন্স ছিল একটি, আর ফখরুল ব্যবসা করেছেন দুটি লাইসেন্সে। তাছাড়া অন্য ব্যবসায়ীরা মূল ১০১ এজেন্সির মধ্যে অথবা সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে ছিলেন; আবার অনেকে ছিলেন শুধু মেডিক্যাল সেন্টার ব্যবসায়। কিন্তু ফখরুলই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব জায়গায় যুক্ত থেকে ব্যবসা করেছেন। অথচ তিনিই এখন নিরাপদ শ্রমিক অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরূপ বক্তব্য দিচ্ছেন।

এছাড়া এই চক্রের অন্যতম হোতা আফিফা ওভারসিজের মালিক আলতাফ খান ইতোপূর্বে মালয়েশিয়ায় কাউন্টার সেটিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ মানবপাচারের অভিযোগে মালয়েশিয়ান দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মূলত বৈধভাবে শ্রমবাজার খুললে অবৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর কারবার বন্ধ হয়ে যাবে, সেই ভয় থেকেই এই চক্রটি ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, কম খরচে নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার। দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি সরকার প্রধানদের স্তরেও নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এসব দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত ছিল। ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয়। তবে বর্তমান সরকার মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেছে। মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনি শর্ত ও নীতিমালার সঙ্গে সর্বোচ্চ সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ ও সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম সাফল্য।

সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্ট’-এ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। বিমানভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মীর প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু হবে।
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত