আলোচনার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা, ইরানের ৫

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

যুদ্ধবিরতিতে যেতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে আলোচনার কথা বলা হচ্ছে, তা গতকাল বুধবার পর্যন্ত শুরু হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলে কী নিয়ে কথা হতে পারে, সে বিষয়ে দেশ দুটির পক্ষ থেকে দেওয়া তালিকা পাকিস্তান ও তুরস্কের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে।

ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরির উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা ইরনা গতকাল জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘সরাসরি বা পরোক্ষ’ কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যা এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বন্ধে ফলপ্রসূ হতে পারে।

আলজাজিরা ও এএফপিসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫ দফা দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতিতে নারাজ স্পষ্টভাবে এ কথা জানিয়ে ইরান স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য আরও সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে। ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, এমন বিবেচনা থেকে পারস্য উপসাগরে আরও সৈন্য নেওয়া হচ্ছে। আর ইরানের সমরবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য তারা গত ২০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন; তারা অপেক্ষায় আছেন।

ইসরায়েলের ইন্ধনে এবারকার যুদ্ধ শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু চতুর্থ সপ্তাহের মাঝামাঝি এসে নেপথ্যে আলোচনার আয়োজন চলতে থাকায় দেশটি যেন খেলার মাঠে ঝামেলা পাকানো বখাটে দর্শকে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনা হলে তাতে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা পাবে কি না, নাকি যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে লড়াইয়ের মাঠ ছেড়ে যাবে, তা নিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার উদ্বিগ্ন।

কী আছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফায় : আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া একটি নথি পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাকিস্তান এখন ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে রাজি হলে পাকিস্তান দেশ দুটির কর্মকর্তাদের আতিথ্য দিতে প্রস্তুত রয়েছে। এর বাইরে, মিসর ও তুরস্ক যুদ্ধ থামানোর জন্য নেপথ্যে দূতিয়ালি করছে। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির পররাষ্ট্রবিষয়ক সহসভাপতি হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেছেন, উত্তেজনা প্রশমিত করে সরাসরি আলোচনার পথ খুলতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আঙ্কারা কিছু ভূমিকা পালন করছে।

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ‘শান্তির জন্য’ ইরানকে যে ‘পরিকল্পনা’ দেওয়া হয়েছে, তাতে আলোচনার জন্য এক মাসের একটি যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। এ আলোচনার মূল ভিত্তি হবে ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও উপকরণ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর করতে হবে। নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা ব্যবহার বন্ধ ও ধ্বংস করতে হবে। ইরানকে ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করা ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নে ইরানকে সহায়তা দেওয়া হবে।

হরমুজ প্রণালি একটি মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে গণ্য হবে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ‘আলোচনা শুরুর’ কথা উল্লেখ করে পাঁচ দিন সময় দেওয়ার পর ইরান বলেছে, শত্রুভাবাপন্ন নয় এমন জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

ইরানকে আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ, আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা সীমিত রেখে তা শুধু আত্মরক্ষার স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে।

ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ইরান বর্তমান শাসনব্যবস্থা বহাল রাখতে পারবে। একই সঙ্গে দেশটির ওপর বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের জারি থাকা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।

ইরানের ৫ দফা : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরান যে পাঁচটি প্রধান দাবি করেছে, তা হলো :

ইরানের বিরুদ্ধে আর কখনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অটল-নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দিতে হবে।

এবারকার যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হামলাসহ সব আঞ্চলিক সংঘাতের সম্পূর্ণ অবসান হতে হবে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ইরানকে এ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রদান করবে।

ইরানের অবিশ্বাস : নেপথ্যে আলোচনার চেষ্টা চললেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিশ্রুতিতে’ ইরানের অবিশ্বাস রয়েই গেছে। ট্রাম্প ‘আলোচনা’ শুরু হওয়ার যে দাবি করেছেন, তার এক দিন পর দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেন, ‘আমাদের কখনো বনিবনা হবে না। ...আর আপনাদের প্রতিশ্রুতির যুগ শেষ হয়ে গেছে।’

পারমাণবিক সমরাস্ত্র নিয়ে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে নিহত হন। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরের চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ বেশ কমে যায়। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি-সংকট দেখা দেয়; দাম বেড়ে যায়।

ইসরায়েলের উদ্বেগ : ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে ট্রাম্প ইসরায়েলের স্বার্থকে সবসময় গুরুত্ব দেবেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন দাবি করলেও এবারকার সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত কী হতে পারে, তা নিয়ে তেল আবিবে নীতিনির্ধারকদের মাঝে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

ইসরায়েলের উদ্বেগের বড় দিক হলো, ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি নিয়ে। এর বাইরে, ইরান ভবিষ্যতে আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করবে কি না, দেশটির নতুন নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণান্ত্র ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে কি না, তাও ভাবাচ্ছে তেল আবিবকে।

আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুতের চেষ্টার মধ্যেও ইরান ও ইসরায়েল গতকাল সীমিত পরিসরে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার লক্ষণ : ট্রাম্প সাময়িকভাবে ইরানে আগ্রাসন স্থগিত করলেও মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে স্থল অভিযানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সদস্যকে মোতায়েন করা হতে পারে। এমন কিছু হলে যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।

অন্যদিকে, ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর গতিবিধি, বিশেষ করে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভূখ- রক্ষায় আমাদের সংকল্প পরীক্ষা করতে আসবেন না।’ ট্রাম্প প্রশাসন এই গালিবাফকে ‘একজন সম্ভাব্য সহযোগী’ ও ইরানের সম্ভাব্য ‘ভবিষ্যৎ নেতা’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

দেশটির নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি বলেছেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন কড়া নজরদারিতে রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে এলে এটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার মাধ্যম খুব সীমিত হয়ে আসায় বিকল্প কমে এসেছে। উত্তেজনা আরও বাড়লে কৌশলগত লাভ তাতে খুব কম হবে। নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানে যুদ্ধ অভ্যন্তরীণ চাপ কিছুটা কমিয়ে দিলেও সামনে ঝুঁকি থাকবে। তখন তিন দেশের সামনে কঠোরতম বিকল্পগুলোই শুধু খোলা থাকবে। হামলা পাল্টা-হামলায় ধ্বংসলীলা চলতেই থাকবে। বৈশি^ক পরিসরে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ।

বিশে^র আর্থিক খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্ল্যাকরকের প্রধান ল্যারি ফিংক সতর্ক করেছেন, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যদি ১৫০ ডলারে পৌঁছায়, তবে তা বৈশি^ক মন্দার সূচনা ঘটাতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত