‘জন্মের আগেই’ যার ক্রিকেট যাত্রার শুরু, দিনে প্র্যাকটিস করেন ১৫০ ছক্কা

'আমার শরীর কিছুটা শক্তিশালী, আর এটা আমি প্রাকৃতিকভাবেই পেয়েছি। এছাড়া আমি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ছক্কা মারার অনুশীলন করি', মুকুল চৌধুরী

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

“আপনার পথচলা নিয়ে কিছু শোনান…”, আইপিএল সম্প্রচারকারীর সঞ্চালক হার্শা ভোগলের এই একটি প্রশ্নেই বেরিয়ে এল এক রূপকথার গল্প। ভারতের রাজস্থানের ঝুনঝুনু থেকে উঠে আসা এক তরুণ, যার ক্রিকেটার হওয়ার বীজ বোনা হয়েছিল তার জন্মের অনেক আগে। তিনি মুকুল চৌধুরী—আইপিএলের নতুন সেনসেশন।

কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেন্সে বৃহস্পতিবার যখন তিনি ক্রিজে এলেন, লাক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের তখন দিশেহারা অবস্থা। জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৪৩ বলে ৭৮ রান। উইকেটে থিতু হওয়া আয়ুশ বাদোনি ও মোহাম্মদ শামি বিদায় নিলে ক্রিজে মুকুলই ছিলেন একমাত্র ভরসা। কিন্তু শুরুতে ৮ বলে মাত্র ২ রান করে ধুঁকছিলেন তিনি। শেষ ২২ বলে দরকার ছিল ৫৪ রান। হার যখন সময়ের ব্যাপার, তখনই শুরু হলো মুকুল-ঝড়।

বৈভাব আরোরা, কার্তিক তিয়াগি আর ক্যামেরন গ্রিনদের ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে ২৭ বলে ৫৪ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেললেন তিনি। ইনিংসে ছিল ৭টি ছক্কা। শেষ বলে ‘বাই’ রান নিয়ে দলকে এনে দিলেন ৩ উইকেটের মহাকাব্যিক জয়।

জন্মের আগের সেই স্বপ্ন

২১ বছর বয়সী এই কিপার-ব্যাটার ম্যাচ শেষে শোনালেন তার শুরুর গল্প। মুকুলের ভাষায়: “আমার যাত্রা শুরু আসলে আমার জন্মেরও আগে থেকে! বাবার যখন বিয়েও হয়নি, তখনই তিনি ভেবে রেখেছিলেন, বিয়ের পর ছেলে হলে ক্রিকেটার বানাবেন। তার স্বপ্ন ছিল এটি। ওই সময় পরিবারের অবস্থা খুব ভালো ছিল না যে, ছেলেবেলায় দ্রুতই ক্রিকেট শুরু করতে পারব। ১২-১৩ বছর বয়সে শুরু করেছি।”

ম্যাচ জিতিয়ে নায়ক মুকুল চৌধুরী

ঝুনঝুনু থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সিকারের এসবিএস একাডেমিতে ৫-৬ বছর তালিম নিয়েছেন। এরপর বড় পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান জয়পুরে। নিজের উন্নতির নেশায় চষে বেড়িয়েছেন দিল্লি-গুরগাঁও। মুকুল বলেন: “ওখানে (ঝুনঝুনু) এত একাডেমি বা এসব ছিল না... জয়পুরে এসেছি, কারণ বড় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতে হলে সামনে এগিয়ে যেতেই হবে। গত বছর আমার মনে হয়েছে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খুব গতিময় হয়ে গেছে। আমাকে অনেক ম্যাচ খেলতে হবে। এজন্য আমি গুরগাওয়ে ছিলাম তিন-চার মাস, দিল্লিতে ম্যাচ খেলেছি। ওসব আমার অনেক কাজে লেগেছে।”

বাবার সেই অটুট বিশ্বাস

ছেলের সামর্থ্যে বাবার বিশ্বাস কবে জন্মাল? সেই স্মৃতি হাতড়ে মুকুল শোনালেন: “বাবা আমাকে বলেছেন যে, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে একটি ম্যাচ ছিল আমাদের, উত্তর প্রদেশের বিপক্ষে। লো-স্কোরিং ম্যাচ ছিল, অন্য কেউ ভালো করতে না পারলেও আমি রান করেছিলাম। ওই ইনিংসটি, উনি আমাকে বলেছেন যে, ওই দিনই তার বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে, কিছু করতে পারব আমি।”

চাপ জয়ের দর্শন

আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে ২ কোটি ৬০ লাখ রুপির চাপ সামলে মুকুল অবিশ্বাস্য ব্যাটিং করেছেন। চাপের মুখে তার ভাবনাটা একদম পরিষ্কার: “চাপ তো আছেই। তবে সৃষ্টিকর্তা আমাকে সুযোগটা দিয়েছেন, আমার স্রেফ বিশ্বাস থাকে, আমার হাতে যেটুকু আছে, তা করার চেষ্টা করি। কারণ, এটি একটি সুযোগও, বড় কিছু করার সুযোগ। চাপ যেমন আছে, তেমনি নিজের নাম বানানোর সুযোগও আছে। চাপের জায়গায় আমি সেটিই দেখি।”

ইডেন গার্ডেন্সের সেই টানটান উত্তেজনার মুহূর্তেও তিনি মনোবল হারাননি:

“আমার ভাবনায় ছিল, শেষ পর্যন্ত খেলব। যদি শেষ পর্যন্ত খেলতে পারি, তাহলে জিতিয়ে দেব, এই বিশ্বাস নিজের ওপর ছিল। ভেবেছি শুধু শট খেলে যাব, নিজের জায়গায় বল পেলে মারব। বাকিটা দেখা যাবে…।”

আগ্রাসী ব্যাটিং ও দেশপ্রেম

আদর্শ মানেন মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। তাই ব্যাটিংয়েও সেই আগ্রাসন। মুকুল অকপটে স্বীকার করলেন: “ছেলেবেলা থেকেই, যখন থেকে খেলছি, আমি সবসময়ই মেরেই খেলি। বল নিচে-টিচে রাখার খুব ইচ্ছা আমার কখনোই থাকে না। নিজের জায়গায় বল পেলে মারবই।”

ঝুনঝুনুর ছেলেরা সাধারণত সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পছন্দ করে। মুকুল ব্যাট হাতেই দেশের জন্য লড়তে চান। তার মতে, কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও আবেগটা একই: “রক্তে সেটাই আছে… আমি এখানে করছি, তারা সীমান্তে দেশের জন্য করছে..।”

ছক্কা মারার সামর্থ্য নিয়ে তিনি বলেন, “আমার শরীর কিছুটা শক্তিশালী, আর এটা আমি প্রাকৃতিকভাবেই পেয়েছি। এছাড়া আমি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ছক্কা মারার অনুশীলন করি; আপনি যদি নিয়মিত এটি চালিয়ে যান তবে ব্যাটের গতি বাড়ে। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে আমি প্রচুর অনুশীলন করছি, যার ফলে এটি এখন আমার খেলার সহজাত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”


×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত