আরও এক স্বর্ণযুগের অবসান

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২০ এএম

আরও এক স্বর্ণযুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে চিরঘুমের দেশে পাড়ি জমালেন বহু বিশেষণ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত উপমহাদেশের কিন্নরকণ্ঠী ও সুর সম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে। ভারতীয় সংগীত জগতের অনন্য এই প্রতিভা আট দশকেরও বেশি সময় অসংখ্য ভাষায় গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, গজল থেকে আধুনিক বিভিন্ন ধারায় তার সমান দক্ষতা তাকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। কিংবদন্তি এই সংগীতজ্ঞের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীরা। বিশেষ করে ভারতের সংগীতাঙ্গনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গন, বলিউড, টলিউড এমনকি ক্রীড়াঙ্গনেও বইছে মাতম। এই বিয়োগব্যথা স্পর্শ করেছে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনেও। দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা থেকে শুরু করে সাবিনা ইয়াসমিন, কনকচাঁপা, বেবী নাজনীনের মতো নন্দিত সিনিয়র তারকারাও শোক প্রকাশের পাশাপাশি স্মৃতিচারণও করেছেন। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীসহ আশা ভোঁসলের সহকর্মী, সহশিল্পী, সুরকার ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরাও তাকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী অনুরাধা পাড়োয়াল বলেন, ‘খুবই কষ্টের একটা দিন। একটা যুগের অবসান। ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না কী বলব। ভীষণ ভালো শিল্পী ছিলেন, ভালো মানুষ ছিলেন। জীবনের শেষ শ্বাস পর্যন্ত গান গেয়ে গেলেন। তার সঙ্গে যখনই কোথাও দেখা হতো, অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কথা বলতেন। ভালোবাসতেন।’ আশার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও প্রিয় মানুষ  ঊষা উত্থুপ এই খবর পাওয়ার পর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আশা জি চলে গেছেন, এটা ভাবতেই পারছি না। আমার সারা জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে ওনার সঙ্গে। উনি আমার জীবনেরই অংশ। একদিনও যায় না যেদিন আমি ওনার কথা ভাবি না। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে ভারতীয় সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আজ নিভে গেল। তিনি শুধু একজন মহান গায়িকাই ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। তার গান এবং তার ব্যক্তিত্ব আমাদের সবার কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দিদি আর বোনের মতো। তার এই চলে যাওয়া সংগীত জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন।’

অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা বলেন, ‘ভাবতেই পারছি না আশাদি আর নেই। এই তো সেদিন বিদেশ থেকে অনুষ্ঠান করে এলেন। জানি বয়সটা বড় ফ্যাক্টর। তবুও... লতাদির চলে যাওয়ার পর আশাদি-ই ছিলেন আমাদের সবার মাথার ওপর একটা বড় ভরসা। আজ মনে হচ্ছে মাথা থেকে ছাতাটা সরে গেল।’

অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এ আর রহমান বলেন, ‘আশা ভোঁসলে ছিলেন ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিভা। তার কণ্ঠ ছিল অসাধারণভাবে বহুমুখী, এবং তিনি ভারতীয় সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রেখেছেন।’ নতুন প্রজন্মের গায়িকা হার্ষদীপ কৌর তাকে সংগীতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, ‘ভালোবাসার কণ্ঠ আর আমাদের মধ্যে নেই... তিনি ছিলেন সংগীতের একটি প্রতিষ্ঠান। গায়িকা আলকা ইয়াগনিক নারী প্লে-ব্যাক গায়িকাদের জন্য তার অবদান তুলে ধরে বলেন, তিনি নারী প্লে-ব্যাক শিল্পীদের জন্য স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন।’ গায়ক উদিত নারায়ণ তাকে প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হিসেবে স্মরণ করেন। সুরকার ও গায়ক বিশাল দাদলানি তার মৃত্যুতে একে ‘যুগের অবসান’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার মতো কণ্ঠ আর কখনো পাওয়া যাবে না।

চলচ্চিত্র নির্মাতা করণ জোহর তার শোকবার্তায় উল্লেখ করে লিখেছেন, এটি সত্যিই একটি যুগের অবসান। তিনি বলেন, ‘গজল থেকে শুরু করে পপ সংগীতের উচ্চগ্রাম সবক্ষেত্রেই আশা জি ছিলেন সমান সাবলীল। প্রতিটি গানে তিনি নিজস্ব প্রাণশক্তি আর ব্যক্তিত্ব ঢেলে দিতেন যা এই জগৎকে এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে দাঁড় করিয়েছে।’  বলিউড কিং শাহরুখ খান লিখেছেন, ‘আশা তাই-য়ের বিদায়ের খবরটা সত্যিই খুব দুঃখের...। তার কণ্ঠস্বর ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্তম্ভ ছিল এবং আগামী শত শত বছর ধরে বিশ্বজুড়ে তা অনুরণিত হতে থাকবে। এমন এক প্রতিভা, যা অনেকের চেয়েও বেশিদিন টিকে থাকবে, তিনি সব সময় আমাকে আশীর্বাদ আর ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে খুব মিস করব আমি। শান্তিতে থাকুন আশা তাই ভালোবাসি।’

ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে বলিউড তারকা অক্ষয় কুমার বলেন, ‘এই ক্ষতি অপূরণীয় এবং তার সুরের আওয়াজ চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।’ অভিনেত্রী কাজলের মতে, ‘আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সুরের জাদুকর।’ আরেক বলিউড তারকা ও সংসদ সদস্য কঙ্গনা রানাউত তার প্রিয় শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘আশা জির চলে যাওয়ার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান ঘটল।’

শুধু সংগীত জগতের পাশাপাশি ক্রিকেটের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ ছিল আশা ভোঁসলের। ব্রেট লি’র সঙ্গে গান গেয়েছেন তিনি। শচিন  টেন্ডুলকারের প্রতি তার স্নেহের কথাও অজানা নয় কারও। সুর সম্রাজ্ঞীর প্রয়াণে ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন প্রথমে লতা মঙ্গেশকর, এবার আশা ভোঁসলে। আলাদা ঘরানা কিন্তু রাজকীয় ছোঁয়া। তার অনেক সেরা গান রয়েছে, তবে আমার প্রিয় ‘উমরাও জান’। রফি, কিশোর, মুকেশ, মান্না দে, তালাত, গীতা দত্ত, লতা ও আশার প্রজন্মের শেষজনও চলে গেলেন। অবশ্যই একটা যুগের অবসান। ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ও বাংলার মেয়ে ঝুলন গোস্বামীও তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশা ভোঁসলের প্রয়াণে। তিনি লিখেছেন, ‘আশাজির মৃত্যুর খবর পেয়ে খুবই খারাপ লাগছে। ওর কণ্ঠে শুধু সুরই ছিল না, প্রতিটা প্রজন্মকে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো আবেগ ছিল। ভারতের সংগীত জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। ওর আত্মার শান্তি কামনা করি।’

এদিকে বাংলাদেশের কিংবদন্তি রুনা লায়লার কেবল সহকর্মীই নন, আশা ভোঁসলে ছিলেন তার কাছে বড় দিদি, মেন্টর এবং পরম বন্ধু। তাই প্রিয় ‘আশাদি’র প্রয়াণে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন রুনা। জানালেন তাদের সেই না বলা বন্ধুত্বের গল্প। রুনা লায়লা জানান, শৈশব থেকেই তিনি আশা ভোঁসলের গানের ভক্ত ছিলেন। তার কথায়, ‘ছোটবেলায় আশাদির গান শুনতাম আর তার গলার সেই সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো নকল করার চেষ্টা করতাম। তিনি আমার কাছে এক অমূল্য রত্ন  ছিলেন।’ পরে রিয়েলিটি শো ‘সুর ক্ষেত্র’-এর বিচারক থাকাকালে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। রুনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘শুটিংয়ের ফাঁকে আমরা এত গল্প আর হাসাহাসি করতাম যে প্রোডিউসার আমাদের সিট আলাদা করে দিয়েছিলেন যাতে কাজে ব্যাঘাত না ঘটে। কিন্তু আশাদি জেদ ধরেছিলেন আমি তার পাশের চেয়ারেই বসব। আর আশাদিকে ‘না’ বলার সাধ্য ছিল না।’

বাংলাদেশের আরেক বর্ষীয়ান গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে নেই ভাবতেই পারছি না। ছোটবেলা থেকেই তাকে চিনতাম। তবে সামনা-সামনি তাকে দুবার দেখার সুযোগ হয়েছিল, যা আজও আমার মনে দাগ কেটে আছে। কলকাতায় ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার গান শুনে তিনি এত প্রশংসা করেছিলেন যে আমি লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম। আশা ভোঁসলের মতো এত ভালো মানুষ আমি কম দেখেছি। এত বড় শিল্পী হয়েও তিনি ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। তার সান্নিধ্যে না এলে তা বোঝা সম্ভব নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত