সাহসী বাংলাদেশ, স্মরণীয় জয়

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টা। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তখনো ঝলমলে রোদ্দুর। মাঠের সব পাশ আলোয় আলোকিত, গ্যালারিতে উৎসবের অপেক্ষা। কিন্তু পাকিস্তান শিবিরে তখন অন্ধকারের ঘনঘটা। নিজের শেষ স্পেলটা দিয়ে প্রতিপক্ষ শিবিরে এই অন্ধকার যিনি নামিয়ে এনেছেন, সেই নাহিদ রানা তখন একটি উইকেটের অপেক্ষায়, যে অপেক্ষা বাংলাদেশ দলেরও। গতির ঝড়, বাউন্সার, রিভার্স সুইংয়ে পাকিস্তানকে দিকভ্রান্ত করে ২৩ বছরের বয়সী পেস সেনসেশন শাহিন আফ্রিদিকে ফিরিয়ে দিলেন অল্প সময়ের ব্যবধানে। মিরপুরের শেষ বিকেলের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গর্জনে ফেটে পড়ল গ্যালারি, উৎসবে মাতল বাংলাদেশ।

এই উৎসব আছে পুরো ম্যাচে দাপট দেখানোর তৃপ্তি, ঐতিহাসিক জয় তুলে নেওয়ার গৌরব। পাকিস্তানের বিপক্ষে আগেও টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ, সেটাও ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু এবারের অবিস্মরণীয় জয়ে শাসন বা কর্র্তৃত্ব জারি রেখে ম্যাচের লাগাম ধরে রাখায় বাংলাদেশ ছিল অনন্য। দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে স্রেফ একটি ম্যাচ জেতার আনন্দ, কিন্তু টেস্টের পথচলায় যা ‘বিশেষ’ এক জয়। পুরো ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিংয়ে কর্র্তৃত্ব ধরে রাখা বাংলাদেশ পরিকল্পনায় মুনশিয়ানা দেখানোর পাশাপাশি নিয়েছে সাহসী সিদ্ধান্তও। যা সচরাচর বাংলাদেশকে করতে দেখা যায় না। আছে অন্য মাহাত্ম্যও, এবারই প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জিতল তারা।

এই টেস্টে বাংলাদেশের শুরুটা হয় টস হার দিয়ে, বাংলাদেশকে আগে ব্যাটিংয়ে যেতে হয়। দুই ইনিংসেই দারুণ ব্যাটিংয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত অবশ্য টসে জিতলে ব্যাটিংই নিতেন বলে জানান। শান্তর সেঞ্চুরি, মুমিনুল হকের নব্বই ছাড়ানো ইনিংসের পর মুশফিকুর রহিমের লড়াইয়ে প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে মেহেদী হাসান মিরাজের বাজিমাত এবং তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলামের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে ৩৮৬ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান।

প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ শান্ত ও মুমিনুলের হাফ সেঞ্চুরিতে ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে। ২৬৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তান শুরুতেই খেই হারনোর পর ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করেও রেহাই পায়নি। তাসকিনের ব্রেক থ্রু, মাঝে গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভেঙে তাইজুলের ভেল্কি ও নাহিদের আগুন ঝরানো শেষ স্পেলে সফরকারীদের ইনিংস থেমে যায় ১৬৩ রানে। অসাধারণ এই জয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে ধারাবাহিকতার গল্পই লিখল বাংলাদেশ। দলটির বিপক্ষে টানা তিন টেস্ট জিতল তারা, আগের দুটি জয় ছিল রাওয়ালপিন্ডিতে, ২০২৪ সালে।

চতুর্থ দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল জানিয়েছিলেন, শেষ দিনে আরেকটু ভালো ব্যাটিং করে ৭০ ওভারে পাকিস্তানকে ২৬০ রানের লক্ষ্য দিলে এই ম্যাচ জেতা সম্ভব। তবে বাংলাদেশের এই পরিকল্পনায় সংশয় প্রকাশ করেন পাকিস্তানের অলরাউন্ডার আগা সালমান। তিনি জানান, ২৬০ রানের লক্ষ্য পেলে তারা জয়ের জন্যই খেলবেন। কিন্তু বাংলাদেশ এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে বলে তার মনে হয় না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সংশয় থাকলেও বাংলাদেশ সেদিকে দৃষ্টি দেয়নি, ম্যাচ জেতার জন্য যে সাহস দেখানো দরকার, সেটাই করেছে ঘরের মাঠের দলটি।

মুখে চওড়া হাসি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা শান্ত জানান, আগা সালমানের মন্তব্যের ব্যাপারে তিনি কিছুই শোনেননি। তবে নিজেদের সাহসী সিদ্ধান্তের কথা গর্ব নিয়েই বলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘আমার মনে হয়, ব্যাটিংয়ে আমরা সকাল থেকে পরিষ্কার ছিলাম আমরা কী করতে চাই। সত্যি বলতে আরও ১৫-২০ রান করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কিছু সময়ে এ রকম সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জরুরি। টেস্ট দলটা ধীরে ধীরে উন্নতি করছে, ওপরের দিকে যাচ্ছে। তো আমরা একটু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আমাদের সাহায্য করবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কারণ হলো, আমাদের যে বোলিং আক্রমণ আছে, যে পাঁচ বোলার নিয়ে আমরা এই ম্যাচে খেলেছি, সবাই দক্ষ এবং সবাই ভালো বোলিং করেছে।’

আগা সালমানের মন্তব্য সম্পর্কে জানতেন না শান মাসুদও। এ বিষয়ে পাকিস্তান অধিনায়ক বলেন, ‘আমার কোনো ধারণা নেই।’ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের ভুলের কথাই উল্লেখ করলেন শান, ‘দেখুন, আমার মনে হয় চা বিরতিতে আমরা ভালো অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু বিরতির পর আমরা কয়েকটি উইকেট হারাই। আর ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার দিক থেকে আমার মনে হয়েছে, কয়েকজন ব্যাটসম্যানের বোঝা উচিত ছিল যে, আমরা তখনো লক্ষ্য থেকে কিছুটা দূরে ছিলাম। তাই নিজেদের ম্যাচে ধরে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমরা ভুল সময়ে উইকেট হারিয়েছি। আমার মনে হয়, আমরা আরও ভালো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।’

পঞ্চম দিনের মাঠের লড়াই শুরু হয় বাংলাদেশের ব্যাটিং দিয়ে। ১৭৯ রানের লিড ও ৭ উইকেট নিয়ে এদিন ব্যাটিংয়ে নামে স্বাগতিকরা। ২০ ওভারে ৮৮ রান তুলে এক উইকেট বাকি থাকতে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। সর্বোচ্চ ৮৭ রান করেন শান্ত, মুমিনুল করেন ৫৬ রান। ২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ইমাম-উল-হককে ফিরিয়ে শুরুতেই তোপ দাগেন তাসকিন। দ্বিতীয় উইকেটে ৫৪ রানের জুটি গড়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন আজান আওয়াইজ ও আবদুল্লাহ ফজল। ১৫ রান করা আওয়াইজকে ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন মিরাজ। কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানের ইনিংসে আঘাত হানেন বাংলাদেশের স্পিডস্টার নাহিদ, তার শিকার শান মাসুদ। চতুর্থ উইকেটে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও জুটিতে ৫১ রানের বেশি যোগ করতে পারেননি আবদুল্লাহ ফজল ও আগা সালমান।

পাকিস্তানের ইনিংসে সর্বোচ্চ ৬৬ রান করা ফজলকে থামান তাইজুল। সৌদ শাকিল চেষ্টা করেও বেশি সময় উইকেটে টিকতে পারেননি, নাহিদের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হওয়ার আগে তিনি করেন ১৫ রান। পাকিস্তানের শেষ ভরসা হিসেবে টিকে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ানকে নিজের তৃতীয় শিকারে পরিণত করেন আগুনে বোলিং করা নাহিদ। শেষের ৩ উইকেট তুলে নিতে বেশি সময় লাগেনি নাহিদ-তাইজুলের। পাকিস্তানকে বিধ্বস্ত দলে পরিণত করা নাহিদ নেন ৫ উইকেট, টেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেট পেলেন তিনি। ১৬ বছর পর ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কোনো পেসার পেলেন ৫ উইকেট। সর্বশেষ ২০১০ সালে চট্টগ্রামে ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেট পান শাহাদাত হোসেন রাজিব। পাকিস্তান ওপেনার ইমামকে ফিরিয়ে ভালোর শুরুটা করে দেওয়া তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে উইকেট নেন। আগের ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়া মিরাজ পান একটি উইকেট।

২০২৪-এ রাওয়ালপিন্ডিতে যেভাবে দুই টেস্ট জিতে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ, ১৬ তারিখ থেকে সিলেটের মাঠে তার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইবেন এখন শান্তরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত