প্রধান চ্যালেঞ্জ স্লুইসগেট মেইনটেন্যান্স ও খালের পলি অপসারণ

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০২:১৫ এএম

জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে চলতি বর্ষা শেষে। অর্থাৎ আগামী বর্ষা কিংবা বৈশাখের বৃষ্টির আগেই সব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ১৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা খরচ করে শেষ হতে যাওয়া এই চার প্রকল্পের পর নগরী জলাবদ্ধতা দুর্ভোগমুক্ত হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা থাকছেই। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে চলমান এসব প্রকল্প শেষ হতে চললেও শঙ্কা কেন?

শঙ্কার কথা জানিয়ে সিডিএর কালুরঘাট থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত কর্ণফুলীর তীরে গড়ে তোলা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার প্রকল্পের আওতায় ১২টি খালের মুখে স্লুইসগেট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি হলো চাক্তাই খাল ও রাজাখালী খাল। এই দুই খাল দিয়ে জোয়ারের পানি গত বছর প্রবেশ করতে পারেনি বলে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ এলাকায় পানি জমেনি। একই সঙ্গে অপর স্লুইসগেটগুলোর কারণে বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ প্রভৃতি এলাকায় জোয়ারের পানি জমেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো একেকটি স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য যে বিদ্যুৎ খরচ, দক্ষ জনবল, জনবলের বেতন রয়েছে সেগুলো মেইনটেইন করার জন্য কি সিটি করপোরেশন প্রস্তুত?

রাজীব দাশের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, রেগুলেটরগুলো পরিচালনার জন্য জনবলের প্রয়োজন। এসব জনবলের বেতনের পাশাপাশি রেগুলেটরের বৈদ্যুতিক বিল এবং পাম্প পরিচালনার বৈদ্যুতিক বিলসহ বছরে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এসব অর্থের জোগান থাকতে হবে। প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও মেইনটেনেন্স বাবদ প্রতিটি স্লুইসগেটবাবদ বছরে গড়ে কমপক্ষে এক লাখ টাকা খরচ হতে পারে। 

প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহেশখাল রেগুলেটরে তিন শিফটে ১২ জন কর্মচারীর বেতন বছরে ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা (মাসিক সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা হিসেবে) ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ বছরে প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে বছরে মেইনটেনেন্স বাবদ খরচ আরও হতে পারে প্রায় দেড় লাখ। সে হিসাবে শুধু মহেশখাল রেগুলেটরে খরচ আসবে ৩১ লাখ টাকা। মহেশখালের মতো এমন বড় রেগুলেটর আছে আরও তিনটি। সেগুলোতেও ৩১ লাখ টাকা হিসেবে বছরে চারটি রেগুলেটরে খরচ হতে পারে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

অপরদিকে ছোট রেগুলেটরগুলোর প্রতিটিতে ছয় জন করে জনবলের বেতন বছরে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা (মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা হিসেবে) আসবে। প্রতিটিতে বিদ্যুৎ বিল বছরে ৬০ হাজার টাকা ও মেইনটেনেন্স বাবদ আরও ৪০ হাজার। সব মিলিয়ে প্রতিটিতে খরচ হতে পারে ১৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাহলে বাকি ৩৫টি রেগুলেটরের পেছনে বছরে খরচ আসতে পারে ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বড় চার রেগুলেটরসহ বছরে মোট খরচ হতে পারে ৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

শুধু কি এই ৬ কোটি ৬৩ লাখ? এর বাইরে রয়েছে স্লুইসগেট দেওয়ার কারণে শহরের ভেতরের অংশে ৩৯টি খালে যে পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমবে সেগুলো ড্রেজিং বা অপসারণ বাবদ খরচ কত হতে পারে? আবার সেগুলো অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ ও জনবলের জন্যও খরচ রয়েছে।

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি ত্রুুটিযুক্ত ও খ-িত প্রকল্প। এই প্রকল্প দিয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে না। যে শহরের ৫৭টি খালের মধ্যে ২১টি খাল বাইরে রেখে ৩৬টি খাল নিয়ে প্রকল্প করা হয়েছে, সেখানে জলাবদ্ধতার পুরোপুরি সুফল আসবে না।

তিনি আরও বলেন, এই খালগুলো পরবর্তীতে কীভাবে সংস্কার করবে কিংবা খালগুলোর মুখে বসানো রেগুলেটর পরিচালনার ম্যানুয়েল কি এখনো তৈরি হয়েছে। সেই ম্যানুয়েল অনুযায়ী যদি সিটি করপোরেশন কাজ করে তাহলে তাদের কি জনবল আছে? এমন অনেক প্রশ্নের মুখে আদৌ এই প্রকল্প থেকে নগরবাসী সুফল পাবে কি না তা নিয়ে আমি সন্দিহান।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, অবশ্যই রেগুলেটর মেইনটেনেন্স ও খাল-নালার ভেতরের জমে থাকা মাটি অপসারণ করতে হবে। এজন্য প্রথমদিকে প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির আওতায় আমরা সার্ভিস দিতে পারি। তবে একসময় এগুলো সিটি করপোরেশনকেই পরিচালনা করতে হবে।

রেগুলেটর পরিচালনার বিষয়ে সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও কালুরঘাট-চাক্তাই প্রকল্পের পরিচালক রাজীব দাশ বলেন, এজন্য সিটি করপোরেশনের একটি মেইনটেনেন্স ইউনিট থাকতে হবে। অন্যথায় এই প্রকল্প পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

অপরদিকে শঙ্কার কথা জানিয়ে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ করা না গেলে জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা যাবে না। নগরীতে উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। যাতে পানি চুইয়ে চুইয়ে মাটির অভ্যন্তরে চলে যেতে পারে। আমরা এখন দেখছি খেলার মাঠ, ঈদগাহ মাঠ, উন্মুক্ত স্থানগুলো কংক্রিটের পেভমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হচ্ছে। এতে মাটির অভ্যন্তরে পানি যাচ্ছে না। সব পানি ওভারফ্লো হয়ে রাস্তায় উঠছে।

শঙ্কার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী ও জলাবদ্ধতা বিষয়ক গঠিত মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল অমিন বলেন, আমরা এই প্রকল্পের আওতায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের জন্য অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের কাজ করছি। একই সঙ্গে এই প্রকল্প সুচারুভাবে সম্পাদনের জন্য আমরা পৃথক আরও দুটি প্রকল্প গ্রহণ করছি। এগুলোর একটি হলো রেগুলেটরগুলো মেইনটেনেন্স নিয়ে এবং অপরটি হলো প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১ খাল সংস্কার নিয়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণ। আর এগুলো করা গেলে প্রকল্প পরিচালনায় সমস্যা হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত