২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ধরা হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঋণ সহায়তা ও বিদেশি অর্থায়ন থেকে আসবে বাকি এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভাশেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী জানান, ‘এডিপির মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘এবারের প্রেক্ষাপট হচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধি, পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন কৌশল। ফলে আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সামনের দিকে যাচ্ছি, এটির পুনরুদ্ধার কীভাবে হবে, উত্তরণ কীভাবে হবে, পুনর্গঠন কৌশলটা কী হবে এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বাজেট পরিকল্পনা হয়েছে।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে এডিপিকে পাঁচটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
জানা গেছে, প্রস্তাবিত এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে এক হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্প সুপারিশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ণ ও কমিউনিটি সুবিধাবলি খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে এডিপির ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ (৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সড়ক ও পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে রাখা হয়েছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি; স্বাস্থ্যসেবায় ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি; প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ১৯ হাজার ৪৪০ কোটি; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১৭ হাজার ৮০৩ কোটি; বিদ্যুৎ বিভাগে ১৪ হাজার ৯৩৮ কোটি; স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণে ৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা রাখা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নৌপরিবহনে আট হাজার ২০৬ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সাত হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এতদিন যেসব জায়গা রাজস্ব আদায়ের বাইরে ছিল, সেগুলোকে এবার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। এ জন্য আমরা এনবিআরের একটি রিফর্ম প্রোগ্রামে যাচ্ছি।
এডিপি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমি বলব না যে, আমাদের বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হবে। প্রবৃদ্ধিটা হবে ক্রমান্বয়ে। তবে কতটুকু প্রবৃদ্ধি হতে পারে, সেটি মাথায় রেখে বাজেট প্রস্তাব করেছি। আশা করি, আগামী দিনে এটি যত বাড়বে, প্রবৃদ্ধির হারও তত বাড়বে; পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাড়বে।
বিগত সময়ে কিছু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি কিংবা অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেসব প্রকল্প এসেছে, সেগুলো চিহ্নিত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুরনো প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। গুরুত্ব যাচাইয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। আর যেসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নেই, সেগুলো বাদ দেওয়া হবে।
