আইসিইউর দরজায় পঙ্গু ভ্যানচালক

ভ্যান বিক্রি করে টাকা দেব, স্যার তাজিমকে বাঁচান

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০৮:২৩ এএম

হামে আক্রান্ত সাত মাস বয়সী শিশু মো. তাজিম দাড়িয়া রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (শিশু হাসপাতাল) আইসিইউতে সুস্থতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে; সেখানে তার সঙ্গে রয়েছে আরও সাত শিশু। আইসিইউর বাইরে দরজার পাশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ফ্লোরে বসে আছেন তার হতদরিদ্র বাবা আসলাম দাড়িয়া।

সারা দেশে আসলাম দাড়িয়ার মতো অসংখ্য বাবা ও মা তাদের শিশুসন্তানদের নিয়ে উদ্বেগে দিন পার করছেন। হামের চোখরাঙানি থামছেই না। ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ইতিমধ্যে সঞ্চয়ের ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মাঝবাড়ি গ্রামের প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক আসলাম দাড়িয়ার। আরও টাকা লাগলে রোজগারের শেষ সম্বল ভ্যানটাও বিক্রি করতে রাজি তিনি, তবু তার ছেলে বেঁচে থাকুক এটাই তার একমাত্র মনস্কামনা।

আসলাম দাড়িয়া গতকাল সোমবার এ প্রতিবেদককে জানান, ‘তাজিম অসুস্থ হওয়ার পর তারা গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যান। সেখানকার চিকিৎসকের পরামর্শে গত রবিবার হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকার শিশু হাসপাতালে তাজিমকে ভর্তি করা হয়। গোপালগঞ্জের হাসপাতালে তার তিন দিন চিকিৎসা চলেছে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।’ 

ডাক্তারের পরামর্শে অসহায় পরিবারটি তাদের সন্তানকে বাঁচাতে রওনা হয় রাজধানীতে। দুই দিনেও ভালো খবর না পেয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে পঙ্গু ভ্যানচালক আসলামের পরিবার।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার জানিয়েছে, যেকোনো সময় খারাপ খবর পেতে পারে হামে আক্রান্ত শিশু তাজিমের পরিবারের লোকজন।

গত রবিবার দুপুর ২টার দিকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ঢোকানো হয় তাজিমকে। সেই থেকে তার বাবা প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক আসলাম দাড়িয়া সরছেনই না আইসিইউর সামনের দরজা থেকে। আর মা হোসনে আরা বেগম আছেন তাজিমের সঙ্গে আইসিইউর ভেতরে। তাদের আশা, তাজিম সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবে।

আসলাম দাড়িয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত দুই দিনে ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আমি তো পঙ্গু মানুষ, ব্যাটারির ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই।’

তিনি জানান, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে তার। নিত্য প্রয়োজন মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। এখন শিশু সন্তান হামে আক্রান্ত হওয়ায় দিশেহারা অবস্থা তার। সন্তানের কী হবে তাও জানেন না তিনি।

আইসিইউর দরজার পাশে বসা আসলাম বলছিলেন, ‘আর পারছি না, আল্লাহ। আল্লাহ তুমি রক্ষা কর। আল্লাহ আমার সন্তানকে বাঁচাও। সুস্থ সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই। আল্লাহ আমার এ চাওয়া পূরণ কর।’

এরই মধ্যে আইসিইউর ভেতর থেকে এক চিকিৎসক বেরিয়ে আসতেই আসলাম বললেন, ‘স্যার আমার সন্তানকে বাঁচান। টাকা দেব। আমি ভ্যান বিক্রি করে দেব। স্যার আমি নিঃস্ব, আমার কিছুই নেই। আছে শুধু পরিবার, ছেলেমেয়ে।’ আসলামকে আশ^স্ত করতে ডাক্তার বলেন, ‘এখানে (হাসপাতাল) টাকা বেশি লাগে না।’  

এই কয়দিনে সন্তানের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন জানিয়ে বিষন্ন মুখে এ প্রতিবেদককে আসলাম দাড়িয়া বলেন, ‘ভ্যান চালাই। আবার পঙ্গু মানুষ আমি। আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই আমার।’

তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার ঝক্কিঝামেলা শেষ করে তাজিমকে ভর্তি করাতেই অল্পস্বল্প সঞ্চয়ের ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেছে। এখন ধারদেনা করছি। জানি না তাজিমের কী হবে? আর সামনের দিনে কীভাবে সংসার চলবে।’ এসব ভেবেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

আসলাম জানান, তিন বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন তিনি। তার দুই পা-ই অচল। শরীরের বেশিরভাগ ভার হাতের ওপর রেখেই চলতে হয় তাকে।

আসলাম দাড়িয়া শিশু হাসপাতাল থেকে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার আশায় থাকলেও আইসিইউর দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম তাকে কোনো ভালো খবর দিতে পারছেন না।

তিনি বলেন, সাত মাসের ছোট্ট শিশু তাজিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সে হামসহ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, রক্তে ইনফেকশন আছে। শিশুটিকে হাই ফ্লো অক্সিজেনে রাখা হয়েছে। অক্সিজেন সরবরাহ করে তার শ্বাস-প্রশ্বাস চালানো হচ্ছে।

ডা. সাইফুল জানান, ‘আইসিইউতে হামে আক্রান্ত ১১ শিশুর মধ্যে আটজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তিনজন আশঙ্কামুক্ত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত