আক্রান্ত পুলিশ শঙ্কিত মানুষ

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৮:১৭ এএম

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে গত ১৩ মে রাতে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। হামলায় পুলিশের এক সদস্য গুরুতর আহন হন। এ ঘটনায় সাতজন গ্রেপ্তার হলেও মূল মাদক কারবারিরা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত বুধবার রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধে জাতীয় গৃহায়নের দখল হওয়া জমি উদ্ধার অভিযানের সময় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। দখলে থাকা লোকজনের ধাওয়ায় পুলিশ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। গতকাল শুক্রবার সিলেটে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন একজন র‌্যাব সদস্য। বরিশালের উজিরপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে যখম করেছে সন্ত্রাসীরা।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর বারবার এমন হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে মাঠপর্যায়ে পুলিশের মধ্যে ভয় ধরেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের ওপর হামলার ধারাবাহিকতায় পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও শঙ্কিত। তবে এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর কঠোর অবস্থানে  গেছে। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। অভিযান বা রাস্তায় টহলে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর এই একের পর এক হামলা এবং তাদের মনোবল ভেঙে পড়ার ট্রেন্ড রুখতে হলে রাষ্ট্রকে জরুরি ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশের ওপর যেকোনো ধরনের হামলাকে অরাজনৈতিক ও কঠোর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ পুলিশের গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে পুলিশ কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের ও জনগণের সেবক। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের জন্য উন্নতমানের সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করতে হবে। হামলার শিকার পুলিশ সদস্যদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং দিতে হবে। পুলিশের মনোবল ভেঙেপড়া মানে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যাওয়া। একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তির চাবিকাঠি থাকে এই বাহিনীর হাতে। হামলার এ সংস্কৃতি এখনই কঠোর হস্তে দমন করতেই হবে।  

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর দেদারসে হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্তব্যরত অবস্থায় একের পর এক পুলিশ আহত হচ্ছে। এতে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মানসিক ও পেশাদারত্বের জায়গায় বড় ধরনের চিড় ধরাচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ সদস্যদের ধারণা, সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা হলে রাষ্ট্র যেভাবে কঠোর হয়, পুলিশের ওপর হামলা হলে অনেক সময় বিষয়টি রাজনৈতিক আপসের খাতায় চলে যায়। এ প্রক্রিয়া মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করে। যখন একজন পুলিশ সদস্য দেখেন যে, ইউনিফর্ম পরা অবস্থায়ও তিনি নিরাপদ নন, তখন তার মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। তারা সার্বক্ষণিক জীবননাশের আশঙ্কায় ভোগেন। এর প্রভাব পড়ে তাদের পরিবারের ওপরও। পুলিশের একটি বড় অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের চোখে পুলিশ এখন আর ‘জনগণের বন্ধু’ নয়, বরং একটি ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। ইমেজ সংকটের কারণে খুব সহজেই পুলিশের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পাচ্ছে। অপরাধ দমনে গিয়েও পুলিশকে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রায়ই।

মাঠপর্যায়ের অনেক পুলিশ সদস্যের ক্ষোভ, হামলার শিকার হওয়ার পর সরকারের উচ্চপর্যায় বা বাহিনীর ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যে ধরনের বলিষ্ঠ আইনি ও নৈতিক সমর্থন পাওয়ার কথা, তা অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু যখন রাস্তায় আমাদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়া হয় বা লাঠি দিয়ে পেটানো হয়, তখন নিজেদের খুব অসহায় লাগে। আমরা তো কারও শত্রু নই, আমরা শুধু অর্পিত দায়িত্ব পালন করি। যখন দেখি আমাদের ওপর হামলা করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকে, তখন পরের বার বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা মরে যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছে। আমরা কারও শত্রু নই। দেশবাসীর সেবক হয়ে কাজ করছি। অথচ পুলিশের ওপর মাঝে মধ্যে হামলা হচ্ছে। তবে যারা পুলিশের ওপর হামলা করেছে, তারা রেহাই পাবে না। পল্লবীর ঘটনায় যারা সম্পৃক্ত আছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

ঢাকার বাইরে কর্মরত এক ইন্সপেক্টর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে আমরা যদি প্রতিনিয়ত মার খাই, আর আমাদের অফিসাররা যদি শুধু বিবৃতি দেন, তাহলে মাঠে ডিউটি করার মনোবল আর থাকে না। এখন হামলার মুখে পড়লে নিজেদের জীবন বাঁচানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, অপরাধী ধরা গৌণ হয়ে যায়।’

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১১ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আজম রোডের একটি গলিতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে পুলিশের একটি দল হামলার শিকার হয়। পরে অভিযানে তিন দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে তাদের হেফাজত থেকে সাবেক কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী সোহাগকে ছিনিয়ে নেয় তার কর্মী বাহিনী। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৬ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮১৪টি। এর মধ্যে চলতি বছরের চার মাসেই ঘটেছে ২১৩টি ঘটনা। ২০২৫ সালে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল ৬০১টি। চলতি বছরেও হামলার প্রবণতা আছে বেশি। চলতি বছরে জানুয়ারিতে ৪২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৬৩ এবং এপ্রিলে ৬৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। ১৬ মাসে ডিএমপিতে ১১২টি, আরএমপিতে ১১, সিএমপিতে ৫৫, কেএমপিতে ১২, বিএমপিতে ১৩, এসএমপিতে ২১টি এবং জিএমপিতে ৩১টি হামলার ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া ঢাকা রেঞ্জে ১৭৬টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১২৩টিসহ বরিশাল, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে সর্বমোট ৫৫৯টি হামলার ঘটনা ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অসংখ্যবার পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইন প্রয়োগ করতে গেলে পুলিশ প্রায়ই বাধার মুখে পড়ছে। এমনকি থানা থেকে আসামি ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। পুলিশের ওপর হামলায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আছে। হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত