শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা নির্মমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই শিশুদের ওপর নির্মমতা চলছে। সামনে হয়তো এমন ঘটনা আরও ঘটবে। সামাজিক অবক্ষয় তো আছেই, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। অতীতে এ রকম অনেক ঘটনাতেই যথাসময়ে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা যায়নি। অপরাধীদের মধ্যে এমন ধারণা কাজ করে যে, বিচার বিলম্ব হবে, কিছুই হবে না, জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসবে। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামে সীমা চৌধুরী হত্যা মামলা থেকে শুরু করে অনেক ঘটনা আছে যে, ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় আসামিরা পার পেয়ে গেছে। মামলাগুলোতে তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তে ত্রুটির মতো ঘটনাও থাকে।
মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে বিচার শুরুর অল্প কিছু দিনে রায় হয়েছে, এটি ঠিক; কিন্তু এটিও সত্য যে, এ মামলা এখনো হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে স্পর্শকাতর মামলাগুলো কেন উচ্চ আদালতে পড়ে থাকবে? উচ্চ আদালতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ও শুনানির কার্যক্রম দ্রুত করা হয় না কেন? যারা গরিব মানুষ, যাদের পেপারবুক তৈরি করার মতো টাকা নেই, তারা তাহলে কী করবে? আসামিপক্ষ তো চাইবে বিচার যত বিলম্ব হয়, তত তাদের জন্য ভালো। কিন্তু আমরা বিচারে আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা চাই না। নতুন করে আর কোনো রামিসার ঘটনা শুনতে চাই না। আমাদের প্রসিকিউশন আছে, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আছে। কিন্তু সেগুলো থেকে এ ধরনের কোনো তৎপরতা দেখি না যে, শিশু হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে কী করতে হবে। উচ্চ আদালতে মামলাগুলো এ জায়গাতে গিয়ে আটকে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলা স্পর্শকাতর। সে ক্ষেত্রে অধস্তন আদালতে রায়ের পর আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি মনিটরিং সেল থাকতে পারে, যাতে মামলাগুলো তদারকি করা যায়। কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সমন্বয় করতে পারে।
ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রামিসার বাবা বিচারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন ‘আমি বিচার চাই না’। তার এই ক্ষোভ যৌক্তিক। বাস্তবতা থেকেই তিনি মূলত বিচারের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি তো দেখছেন বিচারে কি হচ্ছে, না হচ্ছে। এখন তার এই হতাশা ও ক্ষোভ প্রশমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আসামি যেখানে ধরা পড়েছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রয়েছে, আলামতও রয়েছে। এ মামলার অভিযোগপত্র দিতে খুব বেশি হলে আইনেই (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) বলা আছে ১৫ দিন, আমার মনে হয় এক সপ্তাহের বেশি লাগার কথা নয়। অভিযোগপত্র আদালতে যাওয়া মাত্র চার থেকে পাঁচ কর্মদিবসে এ মামলা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তার মানে আমি ধরে নিচ্ছি, এখন থেকে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে বিচারিক আদালতে এ মামলা নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে। আশা করি, উচ্চ আদালতেও একই গতিতে মামলাটি নিষ্পত্তি হবে।
লেখক : প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)
