শিশু ধর্ষণে বিক্ষুব্ধ চট্টগ্রামের দক্ষিণ বাকলিয়া

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম

‘মাদকে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তরুণ-যুবকরা মাদক বিক্রি করে। চারিদিকে মাদকাসক্তের দৌরাত্ম্য। সমাজটা যদি এমন না হতো আমার নাতনি হয়তো ধর্ষণের শিকার হতো না।’ ক্ষোভের সঙ্গে দেশ রূপান্তরকে কথাগুলো বলেছেন চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ধর্ষণের শিকার ৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুর নানি কোহিনুর বেগম। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নগরের দক্ষিণ বাকলিয়া নুর হোসেন চেয়ারম্যান ঘাটার বাসায় গেলে তিনি এসব কথা বলেন।

নাতনিকে ধর্ষণের জন্য মাদকাসক্ত যুবসমাজকে দায়ী করে তিনি বলেন,  ‘পুলিশ এখানকার মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে। মাদকাসক্তরা দিনভর রাস্তায় ঘুরাফেরা করে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকলে আমার নাতনির আজ এই পরিণতি হতো না।’

জানা গেছে, দক্ষিণ বাকলিয়া আবু জাফর রোডের নুর হোসেন চেয়ারম্যান ঘাটার ‘বিসমিল্লাহ ম্যানসনের’ নিচতলায় নানা-নানির সঙ্গেই থাকেন শিশুটি। শিশুটি তার মেয়ের ঘরের নাতনি। শিশুটির বাবা পেশায়  রিকশাচালক। মা পোশাকশ্রমিক। শিশুটির মা নানির কাছে তিন সন্তানকে রেখে বৃহস্পতিবার সকালে চলে যান কর্মস্থল কর্ণফুলী নদীর ওপারে একটি পোশাক কারখানায়। ঘটনার দিন দুপুর ২টার দিকে টিসিবির পণ্য আনতে বাসা বের হন নানি কোহিনুর বেগম। এ সময় বাসায় ছিলেন শিশুটির নানা মো. সিরাজুল ইসলাম। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বাসার সামনে খেলার সময় ওই শিশুকে কৌশলে ডেকে বালুমাঠের মুখে ভাই ভাই ডেকোরেশনের গুদামে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

বিলেক সোয়া ৩টার দিকে বাসায় ফিরে নানি কোহিনুর বেগম দেখেন তার ৪ বছর বয়সী নাতনি যন্ত্রণায় বাসার সামনে মাটিতে কান্নাকাটি ও গড়াগড়ি খাচ্ছে। নানি জানতে চাইলে জানায়, গলা ও মুখ চেপে ধরে এক লোক ব্যথা দিয়েছে। এ সময় শিশুটির প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। লোকটিকে সে চিনে কিনা জানতে চাইলে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়। নানিকে নিয়ে অদূরে ভাই ভাই ডেকোরেশনের কর্মচারী মনিরকে শনাক্ত করে শিশুটি।

বিষয়টি জানাজানি হলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

খবর পেয়ে বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ পৌঁছে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করে। ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর ঘটে যায় লঙ্কাকা-। বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্ত মনিরকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। জনতার প্রতিবাদের মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে অবস্থান নেন। রাত ৮টার পর অতিরিক্ত পুলিশ-র‌্যাব গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সরানোর চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় ভাঙচুর করা হয় একটি কমিউনিটি সেন্টারসহ বেশ কিছু স্থাপনা। ৭ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় পুলিশকে। কাঁদানে গ্যাসের  শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পুলিশ। এ সময় দুজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। আহত হন অনেকে। রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ কৌশলে মনিরকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয়। এরপরও উত্তেজিত লোকজন সড়কে অবস্থান নেয় এবং আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে।

ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে নগরের বাকলিয়া থানায় গত বৃহস্পতিবার রাতেই মামলা করেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা। মামলায় অভিযুক্ত মনির হোসেনকে (৩০) একমাত্র আসামি করা হয়েছে। তার বাবার নাম মো. আলম। বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন ঘারঘাটা বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড এলাকায়।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘শিশুটি ধর্ষণের ঘটনায় থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত মনিরকে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। সে দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েছে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।’

মামলার তদন্ত কার্যক্রম আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে সমাপ্ত করা হবে বলে জানিয়ে হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়া বলেন,  ‘শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা চলছে। সে এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন। ডিএনএ টেস্ট করা হবে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে’।  এ ছাড়া ঘটনার দিন পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং স্থানীয় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাঙচুরের অভিযোগে আরও দুটি মামলা করা হবে বলেও তিনি জানান।

দক্ষিণ বাকলিয়ায় মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে পুলিশ নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হোসাইন কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকাটিতে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কম। পুলিশ মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা যায়। ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকায় পুলিশের আনাগোনা দেখা গেছে। মাত্র ৪ বছরের শিশুর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন মেনে নিতে পারছে না এলাকার কেউ।

আবদুর রহিম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বলে সমাজে অপরাধ দিন দিন বেড়েই  চলেছে।’

স্থানীয় দোকানদার ফারহান হোসেন বলেন, ‘দক্ষিণ বাকলিয়ায় অপরাধ নির্মূল করতে হলে আগে মাদক নির্মূল করতে হবে। এখানে দিনের বেলায়ও মাদকের রমরমা হাট বসে। পুলিশ এসব জেনেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ এলাকায় মাদকসেবীরা ঘুরে বেড়ায়। মাদকমুক্ত হলে অন্যান্য জঘন্য অপরাধে হয়তো কম জড়াবে যুব সমাজ। আমরা ধর্ষক মনিরের ফাঁসি চাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত