৫ ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও পালিত হয় দিবসটি। দিবসকে উপলক্ষ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিয়ে থাকে বিভিন্ন কর্মসূচী। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও দিবসটি পালন করে থাকে।
গৃহীত কর্মসূচীর মধ্যে সাধারণত দেখা যায় র্যালি, সভা, সেমিনার, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে রচনা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা আয়োজন ইত্যাদি। এছাড়াও পোস্টার সাঁটিয়ে সাধারণ মানুষকে দিবস সম্পর্কে অবহিত করতে এবং দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ও স্লোগান প্রচার করতেও দেখা যায়।
কিন্তু কোনো দেশ বা স্থানের পরিবেশ সংরক্ষণ শুধুমাত্র বিক্ষিপ্ত কিছু কর্মসুচীর উপর নির্ভর করে না। পরিবেশ সংরক্ষণের সফলতা নির্ভর করে বিজ্ঞান ভিত্তিক কর্মসুচী গ্রহণ, ধারাবাহিক ও নিবিড়ভাবে তা বাস্তবায়ন এবং সময় সময় তার অগ্রগতি পর্যালোচনা ও সংশোধনের উপর।
এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিবাদ্য হল "প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য"। অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্যপূর্ণ জলবায়ুর গুরুত্বকে দিবসের উপজীব্য করা হয়েছে। কেননা পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব নির্ভর করে ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ূর উপর। এর যেকোনটির অস্বাভাবিক পরিবর্তন মানুষ ও প্রাণীজগতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিগত এক দশকের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং স্লোগানের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকেই উপজীব্য করা হয়েছে। যেহেতু এগুলো বর্তমান সময়ে প্রধানতম বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা তাই স্বাভাবিক ভাবেই এগুলো এখনকার আলোচনার মূখ্য বিষয়।
তাই পরিবেশ দিবস পালনের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের তাৎপর্য ও তা ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে বার বার। বলাবাহুল্য, নির্বিচারে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস ও জীবাশ্ম জ্বালানীর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ পৃথিবীর ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশকে আজ হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই পৃথিবীকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রসমূহ নিয়েছে নানা রকম কর্মসূচী।
দিবস কেন্দ্রিক এসব কর্মসূচীর ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও পরিবেশ সংরক্ষণের সফলতা নির্ভর করে সঠিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উপর। বাংলাদেশ পরিবেশ সংক্রান্ত প্রায় এক ডজন আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।
এ ছাড়াও রয়েছে ১০ টির মত বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলাধার, বন্যপ্রানী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এসব আইন ও বিধিমালা তৈরি হয়েছে। জীববৈচিত্র সংরক্ষণের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে পরিবেশ সংরক্ষণের সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বন, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করবে। এ যাবতীয় উদ্যেগকে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রস্তুতিমূলক পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করা পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য। পরিবেশ সংরক্ষণে আদর্শ মানদন্ড কী এবং তার অর্জন কতটুকু তা পর্যালোচনার দাবী রাখে।
বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যার ধরন ও ব্যাপকতা বহুমাত্রিক। অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। দেশে নগরায়নের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭১ সালে নগরায়নের হার যেখানে ছিল ৭.৭২% বর্তমানে তা প্রায় ৩৩%। বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম মেগা সিটি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বৃহত্তর ঢাকা মহানগর এলাকায় বসবাস করে। বাড়তি জনসংখ্যার জন্য দিন দিন অবকাঠামোগত উন্নয়ন চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একই সাথে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। একটি আদর্শ শহরে জনপ্রতি ৯ বর্গ মিটার উন্মুক্ত স্থান (পার্ক, খেলার মাঠ ইত্যাদি) থাকার কথা সেখানে ঢাকা শহরে আছে মাত্র ০.১৬ বর্গ মিটার মাত্র। মনে রাখতে হবে শহরের উন্মুক্ত জায়গা একটি অমূল্য সম্পদ। অথচ দিন দিন তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ, পায়ে হাটা এবং বাইসাইকেলের রাস্তা থাকা একটি আদর্শ শহরের জন্য আবশ্যক। এটি নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরী। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য তা অপরিহার্য। অন্যদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের জন্যও তা প্রয়োজন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, শহরের জমির মালিকদের মধ্যে প্রায় প্রতি ইঞ্চি জায়গায় ভবন নির্মান করার প্রবণতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারী সংস্থাও কোনো অংশে কম যায় না। পার্ক কিংবা খেলার মাঠ রাখার চেয়ে বহুতল ভবন তৈরী করা তাদের যেন মূখ্য উদ্দ্যেশ্য। পর্যাপ্ত প্রবহমান জলাধার তথা নদী বা খাল থাকা একটি স্বাস্থ্যকর শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট।
উন্নত দেশের বড় বড় শহরের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই সেখানে নদী বা কৃত্রিম ভাবে তৈরি প্রবহমান জলাধার রয়েছে। এগুলো শহরের প্রতিবেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সহায়ক। ঢাকার চারপাশে একাধিক নদী থাকা সত্ত্বেও যযথাযথ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার অভাবে দূষিত হয়ে গেছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই নদীগুলো শুধুমাত্র পরিবেশ সংরক্ষণেই নয় বরং এগুলো মানুষের চিত্ত বিনোদনের আদর্শ স্থান হতে পারতো। বেদখলকৃত ও ভরাটকৃত নদী ও খাল উদ্ধার করে তা পুনরায় প্রবহমান করা আশু প্রয়োজন।
ঘন বসতিপূর্ণ শহর সবুজায়নের জন্য বেশকিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে। উল্লম্ব সবুজায়ন পদ্ধতি তার অন্যতম। এতে উঁচু ভবন বা দেয়ালের গায়ে কিছু বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদ লাগিয়ে দেয়া হয়। এর সুবিধা হল এর জন্য বাড়তি জায়গার প্রয়োজন হয়না, বায়ূ দূষণ কমায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ রোধ করে এবং ভবনের তাপমাত্রা হ্রাস করে। চীনসহ পৃথিবীর অনেক দেশের শহরে এখন উড়াল সড়কের গায়ে এ ধরণের সবুজায়ন পরিলক্ষিত হয়। ছাদ বাগানের মাধ্যমেও নগর সবুজায়নের লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
এর মাধ্যমে পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি শাক-শব্জি ও ফল-মূলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব। প্রয়াত জাপানি প্রফেসর আকিরা মিয়াওয়াকি কর্তৃক উদ্ভাবিত “মিয়াওয়াকি বন” পদ্ধতিতে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সবুজায়নে একটি কার্যকরী পদ্ধতি যা এখন বহু দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।
অল্প জায়গায় (১০০-৫০০ বর্গ মিটার) দ্রুত সময়ে জীববৈচিত্রসমৃদ্ধ সবুজায়নে এটি একটি কার্যকরী পদ্ধতি। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন “স্কাই পার্ক” ধারণা প্রয়োগ করেও সবুজায়ন করা হচ্ছে। উঁচু এবং বহুস্তরী অবকাঠামোতে উদ্ভিদ দিয়ে সবুজায়ন করে দৃষ্টিনন্দন পার্ক সৃষ্টি করা হয় যাতে শহরের সৌন্দর্য বর্ধন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একসাথে হয়।
এছাড়া সড়ক বিভাজক, সড়ক দ্বীপ কিংবা মাঠের পরিসীমায় বৃক্ষায়ণ করে শহরের পরিবেশকে উন্নত করা যায়। নগরের জলাধারে শোভা বর্ধনকারী বৃক্ষরোপণ করে সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন সংবন্ধনে সহায়তা করে বায়ূমন্ডলের কার্বন হ্রাস ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ কমানো সম্ভব। এ পদ্ধতিসমূহের মাধ্যমে নগরে “আরবান হিট আইল্যান্ড” জনিত প্রভাব হ্রাস করা যায়। এভাবে পরিকল্পিতভাবে জীববৈচিত্রসমৃদ্ধ “প্রকৃতিবান্ধব নগর” গড়ে তোলা সম্ভব।
ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম দূষিত বায়ূর শহর। ২০২৫ সালে পৃথিবীর ১০ টি শীর্ষ বায়ূ দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ইট ভাটা, যানবাহন, শিল্প কারখানা ও নির্মাণকাজ জনিত ধূলাবালি শহরাঞ্চলে দূষণের প্রধান কারণ। এছাড়া যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তুপ দূষণের আরেকটি উৎস। পুরাতন মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন কর্তৃক নির্গত কালো ধোঁয়া শহরের বায়ূ দূষণের প্রধানতম কারণ হলেও এখনও ঢাকার রাস্তায় এ ধরণের যানবাহন দৃশ্যমান। সরকারি যানবাহনেও এই অবস্থা বিদ্যমান।
শহরগুলোতে শব্দদূষণ বর্তমানে একটি গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা। যানবাহনের হর্ন এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকার অতিরিক্ত শব্দ প্রায়ই অনুমোদিত মাত্রা অতিক্রম করে থাকে। এর আর্থ-সামাজিক কুফল উদ্বেগজনক। বায়ু ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন পুরোনো যানবাহন অপসারণ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালু। তাছাড়া ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করে বায়ূ দূষণ হ্রাস করা সম্ভব। কঠিন বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনায় “শূন্য বর্জ্য” ধারণা প্রয়োগ করে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
জলাবদ্ধতা দেশের বড় শহর গুলোর একটি মৌসুমী কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এর অন্যতম প্রধান কারণ। আবার নির্মিত নালাসমূহ নিয়মিত পরিষ্কার না রাখাতে তা ভরাট হয়ে অকার্যকর থাকে। অপর্যাপ্ত ও অপরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শহরে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের অন্যতম উৎস।
পরিশেষে বলা যায় ক্রমবর্ধমান নগরকেন্দ্রীক পরিবেশগত সমস্য আগামীতে সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। নগরকে আরও বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে হলে দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার লক্ষ্যে পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
রাস্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব যথাযথভাবে স্থান দেওয়া অত্যাবশ্যক। এছাড়া বিজ্ঞান ভিত্তিক টেকসই নগর পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করা ও সামগ্রিক কার্যক্রমে তাদের সক্রিয় অংশ নিশ্চিত করা এ অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত।
লেখক : অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
