জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল জানিয়েছে, গেজেটভুক্ত না থাকলে কেউ যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও থাকেন তবে তিনি সরকারি কোন সুযোগ পাবেন না। মুক্তিযোদ্ধা কোটার ক্ষেত্রেও একই আইন থাকবে। কেউ যদি কোটায় চাকরি নিয়েও থাকেন সেটিও হবে অবৈধ।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ( বেবিচক) প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়ে বিতর্ক উঠে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। তার পিতার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশ্ন ও গেজেটভুক্ত না থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) কাছে।
কাউন্সিলের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমির হামজা জানান, শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আমরা অবগত রয়েছি। বিষয়টি হলো তার বাবার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছেন।
তিনি বলেন, যেহেতু গোপালগঞ্জে ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার নামের যে গেজেট রয়েছে তার বাবার নাম সেখানে না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এটি অবৈধ। তার সার্টিফিকেটও বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়। কেবলমাত্র গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধারাই সকল সুযোগ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবেন৷ আর কেউ মুক্তিযুদ্ধো হয়ে থাকলেও যদি গেজেটে নাম নাম না থাকে তবে তিনি কোনো ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবেন না।
তিনি আরও বলেন, বেবিচক এখনো আমাদের নিকট এ বিষয়ে লিখিত কোন কিছু জানতে চায়নি। তারা আমাদের নিকট জানতে চাইলে আমরা এ বিষয়ে লিখিত জানাবো।
তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেবিচকের সদস প্রশাসন অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, শরিফুল ইসলামের নিয়োগসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক বিষয় যাচাই বাছাই এখনও চলমান রয়েছে। আমরা আমাদের এই যাচাই বাছাই শেষ করেই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের নিকট পুরো বিষয় জানতে চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখবো।
জানা যায়, ত্রিমুখী তদন্তের মুখে রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম।
তার পিতা মোশারফ হোসেনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ হওয়ার পর বেবিচক, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শুরু হয় তদন্ত।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, চাকরির সময় শরিফুল ইসলামের দেয়া তার পিতা মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যাচাই বাছাই করা প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে সেখানে গড়মিলও পাওয়া যায়। পাশাপাশি গোপালগঞ্জ জেলার ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকাতেও তার পিতার নাম পওায়া যায়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, খুব তাড়াতাড়ি এ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সদর দপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার পিতা মো. মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের ভিত্তিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে তার পিতা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। জালিয়াতি করে সে এই চাকরি নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেন, শরিফুল ইসলামের সরবরাহ করা তার পিতা মোশারফ হোসেনের নামে ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যুকৃত একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকা অস্বাভাবিক এবং সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে প্রকাশিত গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মো. মোশাররফ হোসেন, পিতা মৃত মো. লোকমান মোল্লার নাম পাওয়া যায়নি । ফলে সংশ্লিষ্ট সনদের বৈধতা ও সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে।
আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেবিচকের নিজস্ব কর্মী ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আন্দোলন শুরু করে। ওই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্তার অভিযোগে কিছু কর্মকর্তার প্রত্যাহার দাবি করা হয়। তার মধ্যে শরিফুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। পরবর্তীতে গোয়েন্দা রিপোর্টেও তাকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলাও চলমান রয়েছে। এমন অবস্থায় অতিসম্প্রতি সে অষ্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।