দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ‘বীরের মর্যাদা’ দেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একইসঙ্গে বিমানবন্দরে প্রবাসীদের যথাযথ সম্মান ও অগ্রাধিকার নিশ্চিতে স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি সম্মিলিত ‘ওয়ার্কিং কমিটি’ গঠনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের আনা এক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রস্তাবটির মূল বিষয় ছিল— ‘দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সমস্যা সমাধান, তাদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী ও টেকসই করা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থের বিষয়ে আলোচনা।’
গুরুত্বপূর্ণ এই প্রস্তাব আনায় বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি আজকে জাতীয় নেতার মতো বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যেন বীরের মর্যাদা দেওয়া হয়। আমরা অবশ্যই এই সংসদে আলোচনার মাধ্যমে তাদের বীরের মর্যাদা দিতে পারি।’
বিমানবন্দরে হয়রানি রোধে ওয়ার্কিং কমিটি
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে বিরোধীদলীয় নেতার ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি দ্রুত গঠন করা গেলে সেখানে এসব বিষয়ে আলোচনা করে সমাধান করা সম্ভব। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। আর বিমানবন্দরে প্রবাসীদের যথাযথ সম্মান ও অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় মিলে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
পাসপোর্ট ও এনআইডি জটিলতা নিরসন
প্রবাসীদের পাসপোর্ট জটিলতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি লিখিত জবাব পড়ে শোনান। তিনি বলেন, বিশ্বের ৭৩টি মিশনের মধ্যে ৭১টিতেই ই-পাসপোর্ট চালু আছে। প্রবাসীরা এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) পাশাপাশি জন্ম নিবন্ধন সনদ (বিআরসি) দিয়েও পাসপোর্টের আবেদন করতে পারছেন। তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের মাধ্যমে পুনরায় আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে মিশনে পাসপোর্ট পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়াসহ কিছু দেশে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রবাসীদের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় বায়োমেট্রিক ও পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য আলাদা জায়গায় যেতে হয় বলে প্রবাসীদের দুর্ভোগ হচ্ছে। এটি সমাধানে সরকার কাজ করছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই মালয়েশিয়া সফর করবেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং বেশি জনশক্তি পাঠানোর বিষয়টি এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বিগত ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের’ সময়কালের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেসময় মানবপাচার ও অর্থপাচার হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ১০০ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে দালালদের খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর ঘটনাগুলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। এসব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিদেশে কোনো প্রবাসীর মৃত্যু হলে দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্ট্যান্ডিং অর্ডার দেওয়া আছে।
শহীদ জিয়ার অবদান ও কর্মমুখী শিক্ষা
জনশক্তি রপ্তানি এবং গার্মেন্টস শিল্পের সূচনাকারী হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এই দুটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে যা বেকারের জন্ম দেবে না। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং ইন্টারমিডিয়েটের পর কর্মমুখী ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সবাই শুধু ডিগ্রি পাস করে বেকার ঘুরবে, এমনটা আমরা চাই না।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বভাবসুলভ হাস্যরসের ছলে উর্দু ও ফার্সি ভাষায় কয়েকটি শায়েরি (কবিতা) শোনান। রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি মির্জা গালিবের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তবে ফুলের পাপড়ি দিয়েও হীরের কলিজা কাটা সম্ভব।’ সংসদে ঐকমত্য থাকলেও রাজপথের রাজনীতির বৈপরীত্য নিয়ে তিনি কিছুটা আক্ষেপও প্রকাশ করেন।