ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে চরম আবেগ ও এক সোনালি যুগের অবসানের মঞ্চ। বয়স ও সময়ের অমোঘ নিয়মে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র এবং লুকা মদ্রিচদের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এটি। কার্যতভাবেই, ২০৩০ সালের পরবর্তী বিশ্বকাপে এই চার মহাতারকার কাউকেই আর মাঠ মাতাতে দেখা যাবে না। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই চার জাদুকরের পায়ের জাদু শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখার জন্য মুখিয়ে আছে কোটি কোটি ভক্ত।
বিশ্বফুটবলের আধুনিক ইতিহাস মূলত এই চারজনই ঘিরেই। তাদের ড্রিবলিং, গোল আর পায়ের জাদুতে গত দেড় দশক ধরে বুঁদ হয়েছিল পুরো দুনিয়া। বিশ্বমঞ্চে তাদের এই শেষবারের মতো একসঙ্গে দেখার অনুভূতি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি এক বুক বেদনারও। উত্তর আমেরিকার এই আসরটি তাই কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং এই চার কিংবদন্তির রাজকীয় বিদায়ের এক স্মরণীয় উপাখ্যান হতে যাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৮ বছর। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে ১৯৯ ম্যাচে ১১৭ গোল ও সর্বোচ্চ ৬১টি অ্যাসিস্ট করা এই ফুটবল জাদুকর বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন। দুই দশকের পেশাদার ক্যারিয়ারে ১১৭৯ ম্যাচে ৯১১ গোল করা মেসির জন্য ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলা প্রায় অসম্ভব, কারণ তখন তার বয়স হবে ৪৩ বছর। অন্যদিকে, ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এটি রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ১৩২০ ম্যাচে রেকর্ড ৯৭৩ গোল করা সিআরসেভেনের ২০৩০ বিশ্বকাপে বয়স হবে ৪৫। ফুটবল ইতিহাসে ওই বয়সে কেবল মিশরের গোলরক্ষক এসাম এল হাদারি বিশ্বকাপ খেলেছেন, যা গতি ও স্ট্যামিনার দিক থেকে কোনো ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডারের পক্ষে অসম্ভব।
একই সমীকরণ খাটছে ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সেরা মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ এবং ব্রাজিলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রের ক্ষেত্রেও। ৪০ বছর বয়সী ক্রোয়াট অধিনায়ক মদ্রিচ দেশের হয়ে ১৯৬ ম্যাচ খেলেছেন, ২০৩০ বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৪৪ বছর। অন্যদিকে, চোটের সঙ্গে লড়া ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৭৯ গোল) নেইমারের বয়স বর্তমানে ৩৪ হলেও ২০৩০ বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৩৮ বছর। নেইমারে বয়সটা বাকি তারকার চেয়ে কম হলেও তার চোট ও বর্তমান ফুটবলকেন্দ্রিক অবস্থান বিবেচনায় তিনিও আছেন ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে।
এই চার মহাতারকার বিদায়ী আসরের পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ ফুটবলারদের মেলা হিসেবেও রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। ফুটবলবিশ্ব যেখানে তরুণদের নিয়ে দল সাজাতে ব্যস্ত, সেখানে এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি ‘বুড়ো’ ফুটবলারদের মাঠে নামতে দেখা যাবে। এবারের বিশ্বকাপে ৪০ বা তার বেশি বয়সী ফুটবলার রয়েছেন ৮ জন, যা বিগত ২২টি বিশ্বকাপের সম্মিলিত রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর আগের সব আসর মিলিয়ে এমন বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র ৭ জন, যার মধ্যে ৬ জনই ছিলেন গোলরক্ষক এবং ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল ৪২ বছর বয়সে গোল করা ক্যামেরুনের রজার মিলা।
এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার হিসেবে নজর কেড়েছেন স্কটল্যান্ডের ৪৩ বছর বয়সী গোলরক্ষক গ্রেইগ গর্ডন। গর্ডন ছাড়াও ৪০-ঊর্ধ্ব আরও তিন গোলরক্ষক এবার বিশ্বমঞ্চ কাঁপাবেন; তারা হলেন জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী ম্যানুয়েল নয়ার, উরুগুয়ের মুসলেরা এবং কেপ ভার্দের ভোজিনহা।
তবে গোলরক্ষকদের বাইরে এবার ৪০ পার করা মাঠের খেলোয়াড়দের সংখ্যাও চমকপ্রদ। এই তালিকায় সবার ওপরে আছেন কাতারের উরুগুয়ে বংশোদ্ভূত স্ট্রাইকার সেবাস্তিয়ান সোরিয়া। ৪১ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফর্মে থাকা রোনালদোর পাশাপাশি বসনিয়ার স্ট্রাইকার এডিন জেকো ও ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচও এই তালিকায় রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই বয়স বিবেচনায় এই আট প্রবীণ তারকার জন্যও এটিই হতে যাচ্ছে শেষ বিশ্বকাপ। একদিকে মেসি-রোনালদো-নেইমারদের বিদায়ের রাগিণী, অন্যদিকে ৪০ ঊর্ধ্ব তারকাদের অভিজ্ঞতার শেষ প্রদর্শনী, সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য আবেগঘন অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।