পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে আবারও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ‘পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। তবে মাত্র দুই বছর আগে সমাপ্ত হওয়া কুয়াকাটার অপর একটি প্রকল্পের কোনো সুফল না পাওয়ায় নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০২৩ সালে সমাপ্ত হওয়া পূর্বের প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটা পৌরসভায় তিনটি উৎপাদক নলকূপ, ১০ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন, ৫৮০টি গৃহসংযোগ, ২০০টি পানির একক উৎস, ৮টি পাবলিক টয়লেট, ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার ড্রেন ও ৩০টি কমিউনিটি টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছিল।
তৎকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট সুপারভাইজার জানান, পৃথক তিনটি ওয়ার্ডে ৩ শতাংশ করে ভূমির ওপর মোট ৩টি পাম্প হাউজ নির্মাণসহ ৮টি ওয়ার্ডের অসহায় পরিবারকে ২৫০টি ফ্রি গৃহসংযোগ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে তা হস্তান্তরও করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, হস্তান্তরের পর বহু বছর (নির্মাণ সময়সহ) পার হলেও এই উৎপাদক নলকূপগুলো আজ পর্যন্ত চালু করা হয়নি। সুযোগ বুঝে দুষ্কৃতকারীরা অনেক পাম্পের মূল্যবান পাম্পা, যন্ত্রাংশ ও পাইপলাইন চুরি করে নিয়ে গেছে।
সরেজমিনে কুয়াকাটার তুলাতলী পয়েন্টের উৎপাদক নলকূপ হাউজ ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে ভবন দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে কোনো যন্ত্রাংশ নেই। বর্তমানে সেখানে স্থানীয় তুলাতলী নূরানী মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ নাইমুর রহমান বসবাস করছেন।
মাদরাসার অপর শিক্ষক হাফেজ মনির জানান, মানুষের পানির চাহিদা পূরণের জন্য এই পাম্প নির্মিত হলেও এটি কখনো আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় বর্তমানে এখানে হুজুর থাকছেন, তবে পৌর কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হলে তারা ভবনটি ছেড়ে দেবেন।
আর প্রকল্পের জন্য জমি দিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী হালিম জানান, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৫ বছর আগে আমার কাছ থেকে ৩ শতাংশ জমি নিয়ে উৎপাদক নলকূপ নির্মাণ করে পৌর কর্তৃপক্ষ। কাজ শেষ হলেও পাম্প চালু হয়নি। জমির কোনো দলিল বা অর্থও আমাকে দেওয়া হয়নি। একদিকে সম্পদ হারিয়েছি, অন্যদিকে চাকরিও পাইনি।
একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুয়াকাটা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র পান্না মিয়া হাওলাদার। তিনি বলেন, জনগণকে নিরাপদ পানি দেওয়ার লক্ষ্যে আমার নিজস্ব ৩ শতাংশ সম্পত্তি মৌখিকভাবে দান করেছিলাম, যার কোনো দলিল করা হয়নি। সেখানে নলকূপ নির্মিত হলেও জনগণ তার কোনো সুফল পায়নি, কাউকেও চাকরি দেওয়া হয়নি।
এদিকে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ৮ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভাটিতে স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ৬৫ হাজার। সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় এখানে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ হাজার পর্যটক, সাময়িক ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার সমাগম ঘটে। গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক হোটেল-রিসোর্ট। ফলে এখানে নিরাপদ পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।
পূর্বের প্রকল্পের এই ব্যর্থতা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসিন সাদেকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এবিষয়ে পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।