- অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা
- নাগরিক দুর্ভোগ চরমে
- বর্ষা এলেই ঘরে ঢুকছে পানি
টানা কয়েকঘন্টার বৃষ্টিতে অচল হয়ে পড়ে বগুড়া মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। রবিবার সন্ধ্যা থেকে অনবরত বৃষ্টির কারণে বগুড়া মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে সড়কসহ ঘরবাড়িতে প্রবেশ করেছে। তবে এদৃশ্য বগুড়া মহানগরে নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর বর্ষাকালে এদৃশ্য চোখে পড়ে। গত ১৭ বছর বগুড়া পৌরসভা থাকাকালে প্রতিবছর ড্রেন, সড়ক, ফুটপাত, অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন বর্তমান নগরবাসির চোখে পড়েনি।
এদিকে বগুড়া সিটি করপোরেশন বাসির দাবি, বিভিন্ন সময়ে বগুড়া শহর জুড়ে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও তার নেটওয়ার্ক সিস্টেম ভাল করে তৈরি করা হয়নি। ফলে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর পথ না থাকাই শহর জুড়ে বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে। আবহাওয়া অফিস সুত্রে জানা গেছে, রবিবার বিকেল থেকে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বগুড়া জেলায় বৃষ্টিপাতে পরিমাণ প্রায় ১৩০ মিলিলিটার।
বর্ষাকালে বগুড়া মহানগরে টানা কয়েক ঘন্টা বৃষ্টি হলেই গুরুত্বপূর্ন এলাকাগুলো পানিতে ভাসতে থাকে। এরমধ্যে সাতমাথা স্টেশন রোড, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, শেরপুর রোড, পার্ক রোড, খান্দার, গালাপট্টি, কারমাইকেল রোড, সুত্রাপুর, টেম্পল রোড, ফতেহ আলী বাজার, বাদুরতলা, কাটনারপাড়া, বড়গোলা, দত্তবাড়ি, টিনপট্টিসহ অন্তত শহরের গুরুত্বপূর্ন ১০/১২টি সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এসময় নিচু দোকানপাট ও বাড়িঘরে পানি ঢুকে যায়। অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন।
বগুড়া মহানগরের বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার মূল কারণ ড্রেন নয়। বরং অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ, কার্যকর ভাবে পানি বের হওয়ার সহজ পথ না থাকা। সেইসাথে ড্রেনগুলোর মধ্যে সঠিক সমন্বয়হীনতা ও নিয়মিত রক্ষাবেক্ষণ না করা। ফলে প্রাকৃতিক ভাবে পানি নিষ্কাশন হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরে প্রায় ৯৯১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে, যার বিপরীতে ড্রেন রয়েছে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। এরমধ্যে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ড্রেনই কাঁচা। পুরানো ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে অধিকাংশ এলাকা যেসব ড্রেন রয়েছে, যার প্রস্থ মাত্র দুই ফুট। যা বর্তমানে পানির চাপ সামলাতে পারছে না। ফলে টানা বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি ছাপিয়ে সড়কে উঠে যাচ্ছে। যা কোন কোন স্থানে হাটু থেকে কোমড় পানি অব্দি তলিয়ে যায়।
এদিকে বগুড়া সিটি করপোরেশনের নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বগুড়া পৌরসভা থাকাকালে বিগত ১৭ বছর শুধু বিভিন্ন প্রয়োজনে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও শহরের পানি নিষ্কাশনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা ড্রেনগুলোর কোন সমন্বয় করা হয়নি। নগরের মাঝে এমন অনেক ড্রেন আছে যার কার্যকর পানি নিষ্কাশনের পথ নেই।
এদিকে নগরের আজিজুল কলেজ এলাকা, মালগ্রাম, আটাপাড়া, বিসিক, বাদুরতলা, চকসুত্রাপুর, খান্দার, কারমাইকেল সড়ক, কাটনারপাড়া, কৈপাড়া, জহুরুল নগর, কামারগাড়ি, পুরান বগুড়া, ওয়াপদা, জামিল নগর, চেলোপাড়া, ভাটকান্দি এলাকায় দেখা যায়, এসব এলাকার বেশির ভাগ ড্রেনই ভাঙা, কোথাও দেয়াল ধরে সংকুচিত গেছে, ময়না আর্বজনা জমে পানি চলাচল পথ বন্ধ। সেইসাথে এসব এলাকায় ড্রেনগুলো পরিস্কার না করায় পানি ধারণ ক্ষমতাও বন্ধ হয়ে গেছে।
নগরের সেউজগাড়ি এলাকার বাসিন্দা আপেল মাহমুদ বলেন, বেশি বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি উঠে। চলাচলে খুব সমস্যা হয়। বাড়ির ভিতরে পানি ঢোকে। যারা নিচু বাসায় থাকে তাদের দূর্ভোগ আরও বেশি।
শহরের জয়পুরপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি হলেই তো জলডুব দিতে হয়। বাড়ির দুপাশে উচু করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাড়িতে এবারও পানি ঢুকবে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মহানগরের বাসিন্দাদের কষ্ট লাঘব হবে কবে।
শহরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় বৃষ্টি হলেই পানি ঢোকে বাড়ি ঘরে। প্রথমে রাস্তায় উঠে যায়। কখনও কখনও হাটু থেকে কোমড় অব্দি পানি উঠে রাস্তায়। চলাচলে অচল হয়ে পড়ে।
ভাটকান্দি এলাকার আখেনুর রহমান রাসেল বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে অবহেলিত এলাকায় বাস করি। বিগত সময়ে কোন উন্নয়ন হয়নি। এখন বর্ষায় পানি বাড়িতে ঢুকছে, রাস্তা ভেঙে নাজেহাল। এলাকার মূল সড়কের কাজ ফেলে ঠিকাদার পালিয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়ার সভাপতি অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন সৈকত বলেন, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রতিটি এলাকাকে সমীক্ষা চালাতে হবে। যাতে নগরের প্রতিটি এলাকায় বৃষ্টি হলেই যাতে কিছু সময়ের মধ্যে পানি নিষ্কাশন হয়ে যায়। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নগরায়নে উন্নয়নে যে কাজই করা হোক না কেন, তা যেন ফলপ্রসু হয়।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী আবু হেনা বলেন, মহানগরের সব ড্রেন এখনও একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করা যায়নি। অনেক জায়গায় প্রধান ড্রেনের সঙ্গে শাখা ড্রেনের সংযোগ ভাল না এবং এতে কার্যকর পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। এ কারণে এক এলাকার পানি অন্য এলাকায় গিয়ে নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।
বগুড়া সিটি প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, প্রতিটি এলাকা পর্যবেক্ষণ করছি। ড্রেনের প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। খুব দ্রুত যাতে শহরের পানি নিষ্কাশন হয় সেবিষয়ে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বড় ড্রেন নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বগুড়া নগরবাসীর এই জলাবদ্ধতা দূর করতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালানো হবে।