নারীর সালোয়ার খোলা ও বুক স্পর্শ করা ধর্ষণচেষ্টা নয় বলে সাজা কমাল পাটনা হাইকোর্ট

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৬ এএম

নারীর পরিধেয় সালোয়ার খুলে ফেলা এবং বুকে চাপ দেওয়া ধর্ষণচেষ্টার প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়- ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক এই রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারকদের আরও সংবেদনশীল হওয়ার ব্যাপারে ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি কমিটির তৈরি করা প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের সব হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্টও ২০১৫ সালের ১৭ মার্চ এক রায়ে বলেছিল, কোনো মেয়ের পায়জামার ফিতা টানা এবং বুক চেপে ধরা ধর্ষণচেষ্টার সমতুল্য নয়। সুপ্রিম কোর্ট সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা করেন এবং বিচারকদের সংবেদনশীলতা বাড়াতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এবার পাটনা হাইকোর্টের একই ধরনের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট এই পদক্ষেপ নিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শোভা গুপ্তা আদালতকে জানান, এ ধরনের ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। অতি সম্প্রতি গত ৯ জুলাই পাটনা হাইকোর্টও এক রায়ে বলেছে যে, এক নারীর সালোয়ার খুলে ফেলা এবং বুকে চাপ দেওয়া ধর্ষণচেষ্টার পর্যায়ভুক্ত নয়।

শুনানিকালে বিচারপতি ভি মোহনা প্রশ্ন তোলেন, এলাহাবাদ হাইকোর্টের মামলার রায়ে বিচারকদের সংবেদনশীল করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা ছিল, তা পাটনা হাইকোর্টে উত্থাপন করা হয়েছিল কি না।

এ সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পাটনা হাইকোর্টের রায়ের দিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন, বিচারকদের নিজেদেরও কিছু গবেষণামূলক পড়াশোনা করার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু তাদের সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুই করছেন না।

সুপ্রিম কোর্ট তার নির্দেশনায় বলেন, সব আদালতকে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলার নির্দেশিকা (হ্যান্ডবুক) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দিতে হবে যাতে পুলিশ বিভাগ এফআইআর দায়ের ও চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় এই নির্দেশিকা মেনে চলে। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে খুব দ্রুত একটি যুক্তিযুক্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করবেন বলেও জানান।

সম্প্রতি পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি পূর্ণেন্দু সিং এক রায়ে জানান, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক নারীর সালোয়ার খুলে ফেলা এবং বুকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তা ধর্ষণচেষ্টা হিসেবে গণ্য হবে না। বরং এই অপরাধটি ‘নারীর শ্লীলতাহানি’র শামিল, যার শাস্তি ধর্ষণচেষ্টার চেয়ে অনেক কম। এই পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির সাজা বাতিল করে দেন হাইকোর্ট।

মামলাটির সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৮ সালে। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ ছিল, তিনি তার বাবার সঙ্গে বিহারের অমরপুরের একটি ছবি তোলার স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। ছবি তোলার পর স্টুডিওর মালিক কম্পিউটারে ছবি দেখানোর অজুহাতে তার বাবাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর স্টুডিওর দরজা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে ওই নারীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেন। মেয়ের চিৎকার শুনে বাবা দরজার দিকে ছুটে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে যান।

ঘটনার পর মামলা দায়ের হলে তদন্ত শেষে নিম্ন আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধর্ষণচেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন। এই সাজাকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিল শুনানির পর পাটনা হাইকোর্ট জানায়, ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ প্রমাণ করার মতো কোনো মেডিকেল রিপোর্ট নথিতে নেই। এ ছাড়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিচার চলাকালীন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। পুরো মামলাটি মূলত ভুক্তভোগী নারী ও তার বাবা-মায়ের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল।

তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রায় দেয় যে, ধর্ষণচেষ্টার অপরাধটি প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। রায়ে বলা হয়, সামান্যতম শারীরিক অনুপ্রবেশের প্রমাণ বা ধর্ষণচেষ্টার স্পষ্ট কোনো মেডিকেল রিপোর্ট ছাড়া ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ ও ৩৭৬ ধারা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।

তবে হাইকোর্ট এও উল্লেখ করে, রাষ্ট্রপক্ষের পুরো অভিযোগটি যদি সত্য হিসেবে ধরেও নেওয়া হয়, তবে তা দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারার অধীনে ‘নারীর শ্লীলতাহানি’র অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বিচারপতি পূর্ণেন্দু সিং তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আপিলকারী ব্যক্তি ওই নারীকে স্টুডিওর ভেতর আটকে রেখে, দরজা বন্ধ করে, তার সালোয়ার খোলার চেষ্টা করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করেছেন। এই কাজগুলো স্পষ্টভাবেই একজন নারীর শালীনতা নষ্ট করার অভিপ্রায়ে করা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু ধর্ষণের চূড়ান্ত চেষ্টা বা শারীরিক অনুপ্রবেশের কোনো প্রমাণ নেই, তাই একে ধর্ষণচেষ্টা বলা যাবে না।

পাটনা হাইকোর্টের এই রায় ও বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখন দেশজুড়ে বিচারক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সংবেদনশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সূত্র: এনডিটিভি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত