জামায়াত আমির

৭০ শতাংশের গণরায়কে অবজ্ঞা করলে, সমাধান হবে রাজপথে

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের রায়কে নস্যাৎ করার যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ৭০ শতাংশ মানুষের প্রদত্ত গণরায়কে অগ্রাহ্য করে যদি জাতীয় সংসদে সংকটের সমাধান না করা হয়, তবে তার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে রাজপথে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ঐতিহাসিক ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্মরণ সভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের শুরুতে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংসদের ভূমিকা নিয়ে বলেন, আজকে অনেক বড় বড় কথা আমরা শুনছি বিভিন্ন দিক থেকে। কিন্তু কাজের বেলায় আমরা এটা খুঁজে পাই না। আপনারা নিশ্চয়ই সংসদ দেখেন। আমি বিশ্বাস করি এই কারণে দেখেন যে এই সংসদকে আপনার মজলুমের সংসদ মনে করেন। সেই মজলুম এমপিরা ওখানে গিয়ে জনগণের জন্য কী বলে, এইটা আপনারা আগ্রহ ভরে শুনতে চান, দেখতে চান। আপনারা মূল্যায়ন করবেন আপনাদের বিবেকের পর্দায়- এ গভীর বিশ্বাস আমাদের আছে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল ফ্যাসিবাদের যাতে বাংলাদেশে আর ফিরে না আসে, এই জন্য সংস্কার সাধন করা এবং একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। অতীতের পচা রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে মানুষকে আশাবাদী করে তোলার জন্যই গণভোট হয়েছিল।

গণভোটের বৈধতা ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলকদের সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সেই গণভোটের ব্যাপারে বলা হয় এইটা তো সংবিধানে নাই; বলা হয় এই চারের প্রশ্ন এত জটিল- আমিই বুঝতে লেগেছে চার ঘণ্টা, জনগণ কীভাবে ভোট দিল? কেন? এই চারের প্রশ্ন তো ১৭ দিন আগে থেকে প্রচার করা হয়েছে, সকল মিডিয়ায় খোলাসা করা হয়েছে, গোপন রাখা হয়নি। আপনারা বুঝাতে চান যে জ্ঞান-বুদ্ধি শুধু আপনাদের আছে, এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের নাই? এতো মানুষকে আপনারা অপমান করছেন। চারের প্রশ্ন জাতি যদি না বুঝে, তো ৩১ প্রশ্ন বুঝে কীভাবে? এগুলা সব গোঁজামিল, ভাওতাবাজি।

তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে একজন বলেছেন, আমরা সব কিছু আগে মেনে নিয়েছি যাতে ভোটটা হয়ে যায়- মানে ভোট হয়ে পকেটে ঢুকে যায়। আরেকজন বলেছেন, টোল মওকুফের কথা বলেছিলাম আসলে ভোট পাওয়ার জন্য। রাজনীতিবিদরা যদি এরকম জাতির সাথে প্রতারণা করে, তাহলে এ দেশের মানুষ যাবে কোথায়? যারা দেশ চালাবে, দেশের জন্য আইন এবং নীতি তৈরি করবে, তাদের মিনিমাম একটা নৈতিক মানদণ্ড থাকা উচিত।

ভোটের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইলেকশনের আগে তারাও বললেন, আমরাও বললাম- সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। জনগণ ৭০ ভাগের মতো ‘হ্যাঁ’ বলল। এখন তারা বলেন যে, ৫১ পার্সেন্ট মানুষ আমাদেরকে রায় দিয়ে পাঠিয়েছে, আমরা এটা মানবো না কারণ আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তো ৫১ বড় না ৭০ বড়? ৭০। আপনাদের দাবি যদি মেনেও নিই, কীভাবে ভোট পেয়েছেন- সে বিতর্ক থেকে গেল ইতিহাসে। সাড়ে তিন ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট করে কী করা হয়েছে, জনগণ বুঝে। এবং এর জন্য রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে, কোনো অসুবিধা নাই। ইতিহাস অবশ্যই এটাকে পর্যালোচনা করবে, ইনশাআল্লাহ। এবং যার যার পাওনা সবাই সময়মতো পেয়েও যাবেন, ইনশাআল্লাহ।

সংসদে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদে আমাদেরকে অনেক সংবিধান শিখানো হয়। অবৈতনিক কিছু শিক্ষক আছেন। হাবভাব যে দুনিয়ার সবকিছু উনারা বুঝেন। তা আমি একটু জিজ্ঞেস করতে চাই, সংবিধান সংশোধন কমিটি নামে কোনো কমিটি কোনো বিধিতে কোনো সংবিধানে আছে কি না? নাই। যদি না থাকে, তো এইটা কেন? এইটা হচ্ছে জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়া। এইটা হচ্ছে গণভোটকে ভুলিয়ে দেওয়া। আমরা পরিষ্কার প্রতিবাদ করে ওয়াকআউট করেছি। সমাধান যদি সংসদে না হয়, সমাধান হবে রাজপথে, ইনশাআল্লাহ।’

জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের ভূমিকা প্রসঙ্গে আমির বলেন, প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে এখানে অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। আমরাই একমাত্র দল, যাদেরকে তারা পছন্দ করে না। তারা বলেছে, বাংলাদেশের সকল দলকে ভারতের মাটিতে আমন্ত্রণ- শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড। আমরা এই লাল কার্ডের পরোয়া করি না। আমরা ভারতের বুকে আশ্রয় নেওয়ার কোনোদিন চিন্তাও করি না। এ দেশ আমাদের দেশ। আমাদের আশ্রয়ের জায়গা ১৮ কোটি মানুষের অন্তর, ইনশাআল্লাহ।

তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমাদের কোনো পিসি-খালার দেশ নাই। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। এই স্লোগান অনেকেই দেন, কিন্তু বাস্তবে প্রমাণ দিতে পারেন না। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নেতৃবৃন্দ জীবন দিয়ে, ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন- বাংলাদেশই আমাদের ঠিকানা। ভারত আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সাথে আমরা সৎ প্রতিবেশীর আচরণ করতে চাই এবং তারাও আমাদের সাথে সৎ প্রতিবেশীর আচরণ করছে- ওটাও দেখতে চাই। এর ভিন্ন কোনো সম্পর্ক কারো সাথেই আমাদের থাকবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন। এ দেশ তার পররাষ্ট্রনীতি কারো ডিক্টেশনে চলুক- এটা আমরা চাই না। এটা জনগণের অভিপ্রায়ে চলবে, ইনশাআল্লাহ।

শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, শহীদ পিতারা বলে গেছেন যে, তাদেরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই হুমকি আপনাদেরকে নয়, কার্যত এই হুমকি জাতিকে দেওয়া হচ্ছে। এই হুমকি আমাদেরকে দেওয়া হচ্ছে। আপনারা আমাদেরকে আলাদা ভাবছেন কেন? আমরা তো প্রথম দিনই আপনাদের ঘরবাড়িতে হাজির হয়ে বলে দিয়েছি যে, এখন থেকে আপনাদের পরিবারের সদস্য- আরেকটা সদস্যের নাম হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আমরা ভয় পাই না। ভয় পাই শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে। আর কাউকে কোনো পাত্তাই দেই না।

আন্দোলনে আহতদের পুনর্বাসনে সরকারের উদাসীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আহত, পঙ্গু ভাইয়েরা যারা আছেন, তাদের জন্য বড় দুঃখ। রাষ্ট্র যদি না দেখে, তাহলে এই রাষ্ট্র হবে অভিশপ্ত রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র হবে অকৃতজ্ঞ রাষ্ট্র, নিমকহারাম রাষ্ট্র। আমরা আশা জাগিয়ে রাখতে চাই যে এই রাষ্ট্র নিমকহারামি করবে না এদের সাথে। কিন্তু যদি করে, তাহলে অতীতে যেমন নিমকহারামদের কোনো ভালো পরিণতি হয়নি, বর্তমানেও হবে না।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, কোনো ভয়-টয় দেখায়া আমাদের কোনো লাভ নাই ভাই। আমরা ওই সমস্ত ভয়কে পাত্তা দেই না। বাংলাদেশ ভয়কে জয় করেই এই ২০২৬ সালে এসে উপনীত হয়েছে। আমরা দাবি করছি, জুলাই সনদে লেখা আছে- শহীদদের এবং আহত যোদ্ধাদের নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন সড়ক এবং স্থাপনার নামকরণ করা হোক। যত তাড়াতাড়ি এটা করা হবে, আমরা ধরে নিব সরকার তত বেশি তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ন্যায্য দাবিগুলা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংসদের ভিতরে আমাদের লড়াই চলবে। আমরা বিশ্বাস করি, এটা আল্লাহরই আইনের ভিত্তিতেই কেবল সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত