নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সাথে মেসির আবেগের গল্প

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

(শতবর্ষের কোপা আমেরিকায় চিলির কাছে সেই ফাইনালে হারের ঠিক দশ বছর পর, লিওনেল মেসি আবার ফিরেছেন নিউ জার্সিতে। এবার উপলক্ষ আরেকটি ফাইনাল—যা তাকে এনে দিতে পারে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট)

“দশ বছর পর যদি কোনো এক মোড়ে আবার তোমার দেখা পাই, ভুলে যেও না আমি সেই মানুষটি থেকে আলাদা, কিন্তু প্রায় একই রকম,”— লস রদ্রিগেজের একটি জনপ্রিয় গানে এভাবেই গেয়েছেন আন্দ্রেস কালামারো। লিওনেল মেসি চাইলে তার গত এক দশকের ক্যারিয়ার নিয়ে একটি রিল তৈরি করতে এই গানের লাইনগুলো ব্যবহার করতে পারেন। ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে তার অপ্রত্যাশিত অবসর ঘোষণা থেকে শুরু করে এই রবিবার নিউ জার্সির একই স্টেডিয়ামে তিনি যা অভিজ্ঞতা করতে যাচ্ছেন—সবকিছুই যেন এক সুতোয় গাঁথা।

জীবনের কাকতালীয় আর কার্যকারণগুলো এমনই হয়। ২০১৬ সালের সেই দাড়িওয়ালা, বিমর্ষ লিও থেকে আজকের প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই মেসির মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে, আবার কিছুই বদলায়নি। টানা তিনটি ফাইনাল হারের ক্ষত থেকে শুরু করে আজ তিনি চারটি শিরোপাজয়ী (যার একটি কাতার বিশ্বকাপ) এক দুর্দান্ত অধ্যায়ের নায়ক, যিনি এই রবিবার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন দেখছেন।

আর্জেন্টাইন জার্সি গায়ে মেসি যেখানে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্তটি পার করেছিলেন, ঠিক সেখানেই এবার পেতে পারেন সবচেয়ে বড় আনন্দ। এটাই একজন নাম্বার টেন-এর জীবন। এমন একজন ফুটবলার যিনি ইতিমধ্যে সবকিছু জিতেছেন, তবুও খেলাটার প্রতি তার তীব্র আবেগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মুখে কিছু না বলেও নিজেকে সেরা প্রমাণ করার তাড়না, আর দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দলের তরুণদের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া—সবই চলছে সমান্তরালে।

সময়টা ছিল ২০১৬ সালের ২৭ জুন। টানা তৃতীয় ফাইনাল হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন লিও। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো-আঁধারি মিশ্রিত মিক্সড জোনে তুর্কো মোহামেদের কাছ থেকে একটি সান্ত্বনার আলিঙ্গন পাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, "আমি অনেক চেষ্টা করেছি। আর্জেন্টিনার হয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা অন্য যে কারও চেয়ে আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। কিন্তু এটাই বাস্তবতা, এটা হওয়ার ছিল না এবং দুর্ভাগ্যবশত আমি এটি অর্জন না করেই চলে যাচ্ছি।"

লিও তখন অনুভব করেছিলেন, দেশের হয়ে শিরোপা জেতা হয়তো তার ভাগ্যে নেই। তিনি আরও যোগ করেছিলেন, "ড্রেসিংরুমে থাকার সময়ই প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এসেছিল তা হলো—আমার জন্য জাতীয় দলের অধ্যায় এখানেই শেষ। ইতিমধ্যে চারটি ফাইনাল (কোপা আমেরিকা ২০০৭, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপ) হয়ে গেল, এটা আমার জন্য নয়। দুর্ভাগ্যবশত আমি চেষ্টা করেছি, এটাই আমি সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম, কিন্তু হলো না। আমার মনে হয় এখানেই শেষ।" একই সাথে পেনাল্টি মিসের দায় নিয়ে বলেছিলেন, "আবারও এমনটা হওয়া অত্যন্ত দুঃখের। তার ওপর আমি পেনাল্টি মিস করলাম। ওরা আগেই একটা মিস করেছিল, তাই লিড নেওয়ার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।"

সেটি ছিল এক ভিন্ন সময়, ভিন্ন গল্প। ব্যালন ডি'অর আর বার্সেলোনার হয়ে অজস্র ট্রফি জেতার পরও মেসিকে তখন নিজ দেশে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হতো। হিগুয়েন বা আগুয়েরোর মতো তারকারা ছিলেন ট্রোলের শিকার। মেসি বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সেই সিদ্ধান্ত স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৪৭ দিন। ভক্তদের আকুল আবেদন আর দেশের জন্য এখনো কিছু করার তাড়না তাকে আবার ফিরিয়ে আনে। তিনি ফিরে আসেন চ্যালেঞ্জ নিতে এবং রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ইকুয়েডরের কিটোর উচ্চতায় হ্যাটট্রিক করে দলকে উদ্ধার করেন।

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার সময় এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফিরেই মেসি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "এমন কিছু কেবল আর্জেন্টিনাতেই ঘটে। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার জন্য এবং ফাইনালে উঠেও ট্রফি না জেতার কারণে সেই দলটিকে রীতিমতো ধুয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বকাপে এবং টানা দুবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে খেলাটা একটা দারুণ অর্জন ছিল, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন না হতে পারায় সেই প্রজন্মের সাথে যে আচরণ করা হয়েছিল তা ঠিক ছিল না।"

নিউ জার্সির এই স্টেডিয়ামেই ২০১২ সালের সেই প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪-৩ ব্যবধানের জয়ে কিংবদন্তিতুল্য পারফরম্যান্স করেছিলেন লিও। কিন্তু ২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে সেই ফাইনাল ভেন্যুটিকে তার জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। তবে ২০২৪ সালে এসে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের স্মৃতিকে জয় করেন তিনি; গ্রুপ পর্বে চিলির বিরুদ্ধে ১-০ এবং সেমিফাইনালে কানাডার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে অবদান রেখে মায়ামির ফাইনালের টিকিট কাটেন।

পজিটিভ এনার্জি, আর্জেন্টিনা জাতীয় দল এবং মেসি—এখন একে অপরের পরিপূরক। এটি কোনো জাদু নয়। মেসি চাইলে আজ টাকার পাহাড়ের ওপর বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অবসর কাটাতে পারতেন, কিন্তু তিনি বারবার চেষ্টা করে গেছেন। জাতীয় দলে তিনি এখন সুখী। ড্রেসিংরুমের তরুণরা তাকে পোস্টার থেকে নামিয়ে ঘরের মানুষ বানিয়ে নিয়েছে, তার সাথে তাস খেলে। আর মেসি স্বপ্ন দেখছেন, ১০ বছর আগের যে গল্পটি বিষাদ দিয়ে শুরু হয়েছিল, এবার তার সমাপ্তিটা যেন ঠিক তার উল্টো অর্থাৎ পরম আনন্দের এক মহাকাব্য দিয়ে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত