সুন্দরবনের কোলঘেঁষে, কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ছয় শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী মসজিদকুঁড় মসজিদ। বাংলার সুলতানি আমলের এই ৯ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইসলামী স্থাপত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং পর্যাপ্ত সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজ ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত এই প্রত্নস্থানে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে সীমিত পরিসরে কিছু সংস্কার কাজ হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপনাটিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বাজেট।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে, দেয়ালে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিয়েছে এবং অলংকরণ ও কারুকাজের অনেক অংশ ম্লান হয়ে গেছে। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা স্থাপনাটির দৃঢ় নির্মাণশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, এই মসজিদ ১৫শ শতকে খান জাহান আলীর সময় বা তার অনুসারীদের উদ্যোগে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। স্থাপত্যশৈলীতে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। মসজিদটি বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। বাইরের প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ দশমিক ৭৬ মিটার এবং ভেতরের অংশ প্রায় ১২ দশমিক ১৯ মিটার। চারটি ইটের স্তম্ভ পুরো অভ্যন্তরকে নয়টি সমান বর্গে ভাগ করেছে, যার প্রতিটির ওপর একটি করে গম্বুজ নির্মিত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুজ্জামান বলেন, এই মসজিদের নামেই আমাদের গ্রামের নাম হয়েছে মসজিদকুঁড়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এটি দেখতে আসেন। মসজিদটি একটি বড় বটগাছের নিচে ছিল। ঘন বন পরিষ্কার করে মসজিদটি পাওয়া যায় বলে শুনেছি। মানুষ মূলত ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে আসে।
মসজিদের মুসল্লি আকরাম হোসেন বলেন, প্রচণ্ড গরমেও মসজিদের ভেতরটা শীতল থাকে। এখানকার পরিবেশ খুবই শান্ত। যদি পর্যটকদের জন্য ভালো ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আরও বেশি মানুষ আসবেন।
মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, আমাদের ইতিহাসের অংশ। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মসজিদকে ঘিরে পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, বিশ্রামাগার, নিরাপদ যাতায়াত, সাইনেজ, পার্কিং এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে এটি সুন্দরবন ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সীমিত বাজেটের কারণে প্রয়োজনীয় সব সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বড় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হবে।
ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, সুলতানি স্থাপত্য এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সব মিলিয়ে মসজিদকুঁড় মসজিদ দক্ষিণাঞ্চলের একটি অনন্য ঐতিহ্য। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এই প্রাচীন স্থাপনাটি শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।