প্রধান শিক্ষকহীন ৮৫ বিদ্যালয়: ভারপ্রাপ্তদের কাঁধে কয়রার প্রাথমিক শিক্ষা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:২১ পিএম
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের জনবল সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান, বিদ্যালয় তদারকি এবং সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮টি অন্যান্য বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের ৮৫টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৪২টি পদ শূন্য। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
 
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
 
উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ হাজার ৮০৬ জন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের সংকট শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
 
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকর বলেন, '২০১৩ সালে সর্বশেষ সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল। এরপর আর কোনো নিয়োগ হয়নি। বর্তমানে ৮৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ১৬ জন চলতি দায়িত্বে রয়েছেন। কিছু পদে পদায়নের উদ্যোগ ছিল, কিন্তু মামলা-জটিলতার কারণে সেটিও সম্ভব হয়নি। এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সমস্যা। দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।'
 
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সংকট শুধু বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। পাঁচটি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে তিনটি শূন্য। এছাড়া চারটি অফিস সহকারীর সবগুলো পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। ফলে বিদ্যালয় পরিদর্শন, তথ্য হালনাগাদ, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
 
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকর বলেন, 'আমাদের নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করতে হয়, বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয় এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু এত কম জনবল দিয়ে এসব দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।'
 
কয়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এইচ এম শাহাবুদ্দিন আহমেদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন ধরে এ পদগুলো শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে, নিয়মিত একাডেমিক তদারকি ব্যাহত হচ্ছে, সহকারী শিক্ষকদের ওপর দ্বৈত দায়িত্বের চাপ বাড়ছে এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময় কমে গিয়ে তাদের শেখার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
 
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিনের মামলা-জটিলতা ও নিয়োগ স্থবিরতা দূর করে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা অফিসে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। তা না হলে উপকূলীয় এই উপজেলার ২২ হাজার ৮০৬ শিক্ষার্থীর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত