দেশে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়া উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেছেন, অনলাইন জুয়া শুধু ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতিই করছে না, এর সঙ্গে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন আর্থিক অপরাধের ঝুঁকিও রয়েছে।
সমাজে অস্থিরতা তৈরিতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবারকেও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মঙ্গলবার সকালে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য তিনি এ কথা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যৌথভাবে অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্রতিরোধে কাজ করছে। বিটিআরসি যখনই কোনো অনলাইন বেটিং বা জুয়ার সাইট শনাক্ত করে, তখনই তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে একটি সাইট বন্ধ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট চক্র নতুন নামে বা নতুন ঠিকানায় একাধিক সাইট চালু করছে। ফলে অনলাইন জুয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমে অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের খেয়াল রাখতে হবে, তাদের সন্তান বা অন্য কোনো সদস্য অনলাইন জুয়া কিংবা বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কি না।
তিনি বলেন, ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’, অর্থাৎ প্রতিরোধের শুরুটা পরিবার থেকেই করতে হবে। পরিবারে সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজও সহজ হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিএফআইইউর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অনলাইন গেমিং, বেটিং, জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট লেনদেনকে সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদনও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন জুয়া এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি আর্থিক অপরাধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে। অনলাইন বেটিংয়ের মাধ্যমে অর্থ একাধিক ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঘুরে শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে এ ধরনের লেনদেন শনাক্তে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একই সঙ্গে জুয়ার অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত, সন্দেহজনক ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাব পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সম্প্রতি অনলাইন জুয়া ও বেটিং দমনে নতুন আইনও করা হয়েছে। এতে অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া এবং বেটিংকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করতে হবে। বিশেষ করে পরিবারকে সন্তান ও তরুণদের অনলাইন কার্যক্রমের বিষয়ে দায়িত্বশীল নজরদারি করতে হবে।
পরিবার থেকেই যদি অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তাহলে এর সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
