সবুজবাগে বিএনপি কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত ইব্রাহীম পলাশ (৩২) হত্যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এ ঘটনায় মোঃ নাঈম ও মোঃ আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে ঘটনার মূল হোতা মোঃ মোস্তফা হোসেন রয়েল এবং তার অন্যতম সহযোগী মোঃ সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে। গ্রেফতারকৃত ও আত্মসমর্পণকারী আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হয় এবং পরবর্তীতে চারজনই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েকদিন পূর্বে সবুজের ভাগ্নে তানভীর স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে প্রসাব করলে গ্যারেজের ম্যানেজার তাকে মারধর করে। এ ঘটনার জের ধরে সবুজ গ্যারেজের ম্যানেজারকে মারধর করে। বিষয়টি নিয়ে গ্যারেজ মালিক রসুল ইব্রাহীম পলাশের কাছে বিচার চাইলে পলাশ লোকজন নিয়ে সবুজকে ধাওয়া দেয়। হামলা থেকে রক্ষা পেতে সবুজ মোস্তফা হোসেন রয়েলের বাসায় আশ্রয় নেয় এবং একপর্যায়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ সময় পলাশের সঙ্গে রয়েলের বাকবিতণ্ডা হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পলাশ রয়েল এবং রয়েলের বাবা-মায়ের ওপর হামলা চালায়। এতে রয়েল ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ওই ঘটনার জের ধরে প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রয়েল তার সহযোগীদের নিয়ে ইব্রাহীম পলাশের দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ সন্ধ্যায় রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে অবস্থানরত ইব্রাহীম পলাশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

হামলার সময় এজাহারনামীয় ১ নং আসামি মোঃ মোস্তফা হোসেন রয়েল তার হাতে থাকা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে সর্বপ্রথম ইব্রাহীম পলাশকে লক্ষ্য করে কোপ দেয়। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে পলাশ ডান হাত দিয়ে কোপ ঠেকানোর চেষ্টা করলে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর পলাশ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে রয়েলসহ তার সহযোগীরা তাকে ধাওয়া করে। কিছুদূর যাওয়ার পর ইব্রাহীম পলাশ রাস্তায় পড়ে গেলে রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে পলাশের দুই হাত দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে। হামলা শেষে তারা বিচ্ছিন্ন হাত দুটি নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় ইব্রাহীম পলাশকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পরপরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন স্থানে অভিযান এবং অন্যান্য গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে। তদন্তে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পুলিশের অভিযানে মোঃ নাঈম ও মোঃ আলী গ্রেফতার হয় এবং পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতা ও অভিযানের মুখে মোঃ মোস্তফা হোসেন রয়েল ও মোঃ সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে।

পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত আসামিদের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র (ছ্যানা), যার দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২৮ ইঞ্চি ও ২৬ ইঞ্চি, উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে নিহত ইব্রাহীম পলাশের ডান হাতের বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং গ্রেফতারকৃত আসামিদের দেখানো মতে ডান হাতের অবশিষ্ট অংশ (কবজিসহ) উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামতসমূহ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃত ও আত্মসমর্পণকারী চার আসামির দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধারকৃত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অন্যান্য তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্তে পুরো ঘটনাপ্রবাহ উন্মোচিত হয়েছে এবং হামলায় অংশগ্রহণকারী সকল সহযোগীকেও ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের স্বার্থে তাদের পরিচয় এ মুহূর্তে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ঘটনায় জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে সবুজবাগ থানা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত