দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় আমাদের ওপর সিন্দবাদের দৈত্যের মতো চেপে ছিল অপশাসন। তার অবসান ঘটে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন পর্যায়ক্রমে নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম, খুনের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে রূপ নেয়। অনেক রক্ত ও আত্মদানের বিনিময়ে জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশ, যেখানে সবাই স্বপ্ন দেখে বৈষম্যহীন একটি দেশের।
জুলাই অভ্যুত্থানের আজ দ্বিতীয় বছর। যে স্বপ্ন নিয়ে, যে প্রত্যাশা নিয়ে এই আন্দোলন, আজ পেছনে ফিরে তাকালে যেন দেখি যেন স্বপ্নভঙ্গেরই ছায়া। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের আশা ছিল আকাশচুম্বী। আন্দোলনের সফলতা এবং তরুণ সমাজের উদ্দীপনায় আমাদের প্রত্যাশার পাল্লা ভারী হয়েছে। আমাদের ভেতরে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা যে সংস্কারগুলো প্রত্যাশা করেছিলাম, যেগুলো হওয়া দরকার ছিল, তার অনেক কিছুই হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সংবিধানের যে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, যাতে করে আর কখনোই নতুন কোনো ফ্যাসিস্টের জন্ম হবে না, সেই উদ্যোগ কিন্তু এখনো শুরু হয়নি। শুধু তাই নয়, আমাদের যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, রাষ্ট্রের যে কাঠামো আছে, সেই প্রত্যেকটি কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এইসব প্রতিষ্ঠান এবং কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন।
আমাদের যে সংস্কারের প্রয়োজন আছে, সেই সংস্কারের দায়িত্ব তাদেরই, যারা ক্ষমতায় রয়েছে। এই কাজগুলো বাইরে থেকে কারও পক্ষে করা সম্ভব না। বরং যারা ক্ষমতায় রয়েছেন, তাদেরই উদ্যোগী হয়ে সংস্কারগুলো করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। মানুষ ভেবেছিল আমাদের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে সহায়ক হবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আমরা দেখছি যে সংস্কারগুলো প্রয়োজন, তার কিছুই হয়নি। ফলে জুলাইয়ের যে স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নটা অধরাই রয়ে গেছে। আরও একটি বড় বিষয় জুলাইয়ে আমরা যে ঐক্যবদ্ধ শক্তি দেখেছিলাম। আজ দুই বছর পর এসে সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর দেখতে পাচ্ছি না।
আমরা দেখছি, জুলাইয়ের সেই ঐক্যবদ্ধতা ভেঙে গেছে। অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোও ভেঙে গেছে, আলাদা হয়ে গেছে। এই যে অনৈক্যের সুর, এটিও আমাদের জন্য হতাশার। এই ঐক্য ভেঙে যাওয়াতেই আমরা দেখিছ একে অন্যের বিরুদ্ধে করছেন বিষোদগার। সরকার এবং বিরোধী দল, যারা জুলাইয়ের অগ্রণী ছিলেন তারাও একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছেন। নানাভাবে অপসংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বলছেন যেন অনেকটা বিদ্বেষ পোষণ করে যা ওই অভ্যুত্থানের বিপরীত চিত্র। অথচ জুলাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে প্রেরণা দিয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে, সবাই একত্র থেকে কাজ করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আমাদের সংকট তো নানামুখী। আমাদের জাতীয় জীবনে সংকট আছে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও আমরা একটা সংকটে আছি। এই সংকটগুলো সমাধানের দিক থেকে যদি আমাদের মনোযোগ কমে যায়, তবে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক সংকটকে আরও গভীর করবে।
জুলাই আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখন এই যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক, যদি এর কারণ অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখব, শুরুতে যে কথাটি বলেছি সেটিই এর পেছনে রয়েছে। বিষয়টি হলো, ঐক্য। আমাদের যে ঐক্যটা ছিল, তা ভেঙে গেছে। জুলাইয়ের ঐক্য ভেঙে শুরু হয়েছে বিভাজনের রাজনীতি, যা আমাদের জন্য বিশেষত দেশের সংকটকালীন মুহূর্তে খুবই নেতিবাচক। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহিঃশক্তির বিষয়টিও। কারণ, শুরু থেকেই জুলাইয়ে আমাদের যে অবস্থান, দেশের জনসাধারণের যে অবস্থান সেই অবস্থানকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি কিছু বহিঃশক্তি। জুলাইয়ের ঐক্য ভেঙে যাওয়ার পেছনে তাদের হস্তক্ষেপও পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছে। চব্বিশের জুলাইয়ে আমাদের যে অবস্থান সে অবস্থানটাকে কিন্তু সেই বহিঃশক্তি মেনে নেয়নি প্রথম দিন থেকেই। যে অনৈক্য আজ দেখছি তাতে ওই হাতগুলোর ইশারা থাকতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রাপ্তি বলতে এখন পর্যন্ত বড় অর্জন বাকস্বাধীনতা, যা গত দুই দশকে ছিল না। মানুষ এখন খোলামেলাভাবে কথা বলতে পারছে। অর্থাৎ ভয়ের অপসংস্কৃতি অনেকটা দূর হয়েছে। মানুষ সামাজিক মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছে, তাদের মনের কথা বলছে। আমি মনে করি এটাই আমাদের একমাত্র প্রাপ্তি হয়েছে।
সেটাও কম কথা না। এ অর্জনও একটি আন্দোলনের বড় প্রাপ্তি। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করেছে। এখন যারা সরকারে রয়েছেন, তাদের উচিত গণভোটের রায় মেনে নেওয়া। গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের যে প্রত্যাশা তা পূরণের প্রতিশ্রুতি কিন্তু অভ্যুত্থানের দলগুলো দিয়েছে। এখন জনগণের মতামত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জনগণের রায়-সমর্থন নিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখন সেই জনগণের যে আরেকটি প্রত্যাশা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও নির্বাচিত সরকারের। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে সমৃদ্ধির দিকে। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতির দিকে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্মিলিতভাবে দেশকে অগ্রসর করতে পারে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
