বারডেমের আলো

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ এএম

ডা. মো. ইব্রাহিম স্যার বারডেম হাসপাতালটি শুরু করেছিলেন ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি চিন্তা করেছিলেন, একজন ডায়াবেটিস রোগী যখন এখানে নিবন্ধিত হবেন তখন তার সম্পূর্ণ চিকিৎসা করানোটাও জরুরি। তাছাড়া তাদের নানা ধরনের জটিলতাও হয়। সেই চিন্তা থেকেই তিনি ডেন্টাল চিকিৎসার কথা ভেবেই আমার মাধ্যমে সেটা বাস্তবায়ন করেন। ১৯৮৬ সাল, আমি তখন আইপিজিএমআর, পিজি হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক। সেখানেই হঠাৎ একদিন ডা. মো. ইব্রাহিম স্যারের দাঁতের চিকিৎসা করার সুযোগ হয়। তখন বারডেম হাসপাতালে ডেন্টাল চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। পরবর্তী সময়ে তিনি বারডেম হাসপাতালে ফিরে এসেই তার রুমে বসে আমাকে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য সরাসরি তদানীন্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ফোন করেন। তার পরের সপ্তাহেই অর্ডার হলো (অর্থাৎ ১৯৮৬ সাল থেকে) আমি পিজি থেকে সপ্তাহে একদিন বারডেমে এসে রোগী দেখব। পরে ১৯৮৭ সাল থেকে আমি সরকারি ডেপুটেশন অর্ডার অনুযায়ী, বারডেমে পরিপূর্ণভাবে ডেন্টাল বিভাগ শুরু করে ডায়াবেটিস রোগীদের মুখ ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা শুরু করি। বিগত ৪০ বছর বারডেমে কর্মরত রয়েছি। ডা. মো. ইব্রাহিম স্যার আমাকে বারডেমে নিয়ে এলেন। কিন্তু, এখানে ডেন্টাল চেয়ার নেই। নিজের চেম্বার থেকে ডেন্টাল চেয়ার এনে কাজ শুরু করেছিলাম। একদিন ইব্রাহিম স্যারকে বললাম আমার রোগী দেখতে অসুবিধা হচ্ছে, আমার জন্য একটা ডেন্টাল চেয়ারের ব্যবস্থা করেন। জাপান থেকে সিটি স্ক্যান মেশিনের সঙ্গে আমার ডেন্টাল চেয়ারও চলে এলো, তার পর থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করি।

সরকার এক বছর করে ডেপুটেশন বাড়ায় আবার এখান থেকে চিঠি দিতে হয়, মেয়াদ বাড়ানোর জন্য, এভাবে যেদিন আমার ২৫ বছর সরকারি চাকরি পূর্ণ হলো, সেদিনই সরকারি চাকরি থেকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের আবেদন করি এবং পরিপূর্ণভাবে বারডেম হাসপাতালে কাজ করতে থাকি। এটাও সম্ভব হয়েছিল ইব্রাহিম স্যারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভক্তির ফলে। কারণ, সরকারি চাকরি তো সহজে কেউ ছেড়ে দিতে চায় না। কিন্তু, আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম ডায়াবেটিস রোগীর সেবাদানের জন্য। পরবর্তী সময়ে, ইব্রাহিম স্যার আমাকে কিছু গবেষণা কাজেও উদ্বুদ্ধ করেন এবং আমি অসংখ্য গবেষণা কাজ সম্পন্ন করি বারডেমের ডেন্টাল বিভাগ থেকে। ডায়াবেটিসের ৫টি জটিলতা যেমন : রেটিনোপ্যাথি, নিউরোপ্যাথি, নেপ্রোপ্যাথি, হার্ট ডিজিজ অ্যান্ড স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ফুট আলসার তার সঙ্গে আরেকটি জটিলতা যুক্ত হয়েছে, সেটাকে ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইডিএফ- ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন নাম দিয়েছে ‘সিক্স কম্পিকেশন অব ডায়াবেটিস ইজ পেরিওডোন্টাল ডিজিজ’ অর্থাৎ ডায়াবেটিসের ষষ্ঠ জটিলতা, মাড়ির রোগ। যেটা ইব্রাহিম স্যার ৪০ বছর আগে বুঝতে পেরেছিলেন এবং আমাকে দিয়ে এই বারডেম হাসপাতালে ডেন্টাল বিভাগ শুরু করেছিলেন। এখানেই প্রমাণ হয় ডা. মো. ইব্রাহিম স্যার ছিলেন একজন তীক্ষè দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিকিৎসা বিজ্ঞানী। বর্তমানে এই ডেন্টাল বিভাগের চিকিৎসার মাধ্যমে বারডেমের লাখ লাখ রোগী তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপন করছেন। প্রতি বছর এখান থেকে ৪০/৫০ জন ডেন্টাল সার্জন বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া এখানে এফসিপিএস, এমএস, পিএইচডি সম্পন্ন করা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আছেন, যারা আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসকের মতোই আধুনিক ডেন্টাল চিকিৎসায় ডেন্টাল সার্জন তৈরি করে দিচ্ছেন। এতগুলো কাজ সম্ভব হয়েছে ডা. ইব্রাহিম স্যারের কল্যাণে, যে কাজটি তিনি আমাকে দিয়েই শুরু করেছিলেন সেই ১৯৮৬ সালে।

ডা. ইব্রাহিম স্যার মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারতেন এবং তাদের দিয়ে কাজ আদায় করে নিতেন। অদ্ভুত এক সম্মোহনী শক্তি ছিল তার এবং তিনি বেছে বেছে সমাজের সমস্ত বিশেষজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মেধাবী লোকদের সমিতির সঙ্গে যুক্ত করতেন। ডায়াবেটিক সমিতির কর্মকর্তাদের তালিকা দেখলেই সেটা অনুমান করা যায়। আমাদের এই বিশাল প্রতিষ্ঠান বারডেম হাসপাতাল এমনিতেই হয়ে যায়নি। এর  পেছনে ডা. মো. ইব্রাহিম স্যারের ছিল রোগীদের জন্য অকৃত্রিম মমতাবোধ ও দরদি মন। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য কিছু একটা করতে পারলেই তিনি যেন অসীম আনন্দ পেতেন। আমার জীবনে আমি এই পরশ পাথরের সান্নিধ্যে আসতে পেরে জীবনটাকে ধন্য মনে করি। আজ আমার শুধু মনে হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে তার মতো একজন চিকিৎসক বিলাতে বা আমেরিকাতে জন্ম নিলে হয়তো নোবেল পুরস্কার পেতেন। কারণ, এখনো পৃথিবীতে কোথাও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও সেবার ক্ষেত্রে এ রকম বড় প্রতিষ্ঠান আর একটিও নেই। আমি বহু আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করেছি এবং সেখানে বিখ্যাত বিখ্যাত ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ও সংগঠককে বিভিন্ন বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, ডায়াবেটিসের জন্য কোনো রোল মডেল হাসপাতাল বা সমিতি সম্পর্কে জানতে হলে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বা বারডেম হাসপাতালের উদাহরণ তারা দিয়েছেন। চাকরি জীবনের অবসরের পর দেশের অনেক বড় ও নামকরা হাসপাতাল থেকে আকর্ষণীয় ও উচ্চ বেতনের প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু ইব্রাহিম স্যারের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা, এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং ডায়াবেটিস রোগীদের সেবা করার অটুট অঙ্গীকার আমাকে অন্য কোথাও যেতে দেয়নি। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, ইব্রাহিম স্যারের স্বপ্ন ও আদর্শকে ধারণ করে আমরা শুধু চিকিৎসাসেবার পরিধিই বিস্তৃত করিনি; ডেন্টিস্ট্রির সব শাখার চিকিৎসাসেবা চালু করার পাশাপাশি ডেন্টাল কলেজের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দক্ষ ডেন্টাল সার্জনও তৈরি করছি। তাদের হাত ধরেই ইব্রাহিম স্যারের মানবসেবা, সততা ও আদর্শের আলোবর্তিতা এমনকি বিশ্বপরিম-লেও ছড়িয়ে পড়বে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা এবং আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা। একুশে ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পদকপ্রাপ্ত দন্ত চিকিৎসক। স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক। 

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত