বাংলা কিউআরে অবৈধ ক্যাশ আউটের অভিযোগ

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

কোনো পণ্য বা সেবা কেনেননি। অথচ মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ১০ হাজার টাকা ‘পেমেন্ট’ করলেন এক তরুণ। এরপর দোকানি তাঁকে ১০ হাজার টাকা নগদ বুঝিয়ে দিলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি সাধারণ একটি মার্চেন্ট পেমেন্ট। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ক্যাশ আউটের বিকল্প পদ্ধতি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাংলা কিউআর পেমেন্টে গ্রাহকের কোনো খরচ না থাকলেও ওই তরুণের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ক্যাশ আউটের নির্ধারিত চার্জ।

রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট বাজারসংলগ্ন একটি দোকানে সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটে। ক্যাশ আউট করতে আসা ওই তরুণকে দোকানি প্রচলিত নিয়মে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা না তুলে একটি ব্যাংকের দেওয়া বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে বলেন। দোকানির নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহক এমএফএস অ্যাপ দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠান। লেনদেন শেষে নগদ টাকা বুঝে পেলেও তিনি জানতেন না, এটি ক্যাশ আউট নাকি পেমেন্ট।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবেই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে একটি অবৈধ ক্যাশ আউট ব্যবসা গড়ে উঠছে। এতে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই মার্চেন্টরা পেমেন্ট গ্রহণ করছেন এবং একই সঙ্গে গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউটের খরচ আদায় করছেন। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য তৈরি করা অবকাঠামোই ব্যবহৃত হচ্ছে নগদ টাকা দেওয়ার বিকল্প পথে।

যেভাবে চলছে কারবার

ধরা যাক, একজন গ্রাহকের ১০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট প্রয়োজন। প্রচলিত নিয়মে তাঁকে একজন এমএফএস এজেন্টের কাছে গিয়ে ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে হবে এবং নির্ধারিত ক্যাশ আউট খরচ দিতে হবে।

কিন্তু বাংলা কিউআরনির্ভর এই পদ্ধতিতে গ্রাহক দোকানে গিয়ে বলেন, তিনি ১০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করবেন। দোকানি তাঁকে নিজের মার্চেন্ট কিউআর কোড দেখান। গ্রাহক এমএফএস অ্যাপ দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে ১০ হাজার টাকা পাঠান। দোকানি এরপর গ্রাহককে নগদ ১০ হাজার টাকা দিয়ে দেন। অথচ এখানে কোনো পণ্য বা সেবা কেনাবেচা হয়নি।

এরপরও অনেক ক্ষেত্রে দোকানি গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউটের নির্ধারিত চার্জ আদায় করছেন। অর্থাৎ, যে লেনদেনটি কাগজে-কলমে মার্চেন্ট পেমেন্ট, বাস্তবে সেটি হচ্ছে নগদ টাকা উত্তোলন।

তিন দিক থেকে অনিয়ম

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন লেনদেনে অন্তত তিন ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রথমত, পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে পেমেন্ট গ্রহণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মার্চেন্ট পেমেন্টে গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউট চার্জ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, ক্যাশ আউটের পরিবর্তে মার্চেন্ট পেমেন্ট দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট লেনদেনে প্রযোজ্য রাজস্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এ ধরনের লেনদেন নিয়মিত ও বড় পরিমাণে হলে তা সন্দেহজনক লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহক যদি জানতেই না পারেন যে তাঁর লেনদেনটি কী ধরনের, তাহলে পরবর্তী সময়ে ওই অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ পাচারের ঝুঁকি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো পণ্য বা সেবা না কিনে মার্চেন্ট কিউআর ব্যবহার করে টাকা পাঠানো হলে লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর সেই অর্থ যদি অবৈধ উৎস থেকে আসে কিংবা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাঠামোর নজরদারিতে আসতে পারে।

এর ফলে শুধু মার্চেন্ট বা এজেন্ট নয়, লেনদেনে জড়িত অন্যান্য পক্ষও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর এজেন্ট বা মার্চেন্ট হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক অনুমোদন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আরও বড় ঝুঁকি হলো, এসব হিসাব ব্যবহার করে জুয়া, হুন্ডি, অনলাইন প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ স্থানান্তর করা হতে পারে।

নজরদারিতে অস্বাভাবিক লেনদেন

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১০ আগস্ট দেওয়া এক নির্দেশনায় মার্চেন্টদের অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিক সংখ্যক বা অস্বাভাবিক ধরনের লেনদেন দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিমভাবে লেনদেন বিভাজন, ক্যাশ আউট বা অন্য কোনো ধরনের অপব্যবহার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলা কিউআর নিয়ে ইদানীং গুজব ছড়ানো হচ্ছে। লেনদেনের পরিমাণ ও সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। কেউ যদি এর অপব্যবহার করে, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, বাংলা কিউআর ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেনকে উৎসাহিত করা। এর অপব্যবহার করে কেউ অবৈধ লেনদেনে জড়ালে তা নজরদারির বাইরে থাকবে না।

এজেন্ট-মার্চেন্ট একই দোকানে কেন

সংশ্লিষ্ট এমএফএস কর্মকর্তারা জানান, এজেন্ট ও মার্চেন্টের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আলাদা। এজেন্ট নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনের মতো সেবা দেন, আর মার্চেন্ট পণ্য বা সেবার বিপরীতে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করেন। ফলে একই দোকানে দুই ধরনের হিসাব থাকলে সেগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে একই দোকানে এজেন্ট ও মার্চেন্ট হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা কিউআর চালুর পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক এজেন্ট পয়েন্টে মার্চেন্ট কিউআর স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এজেন্ট পয়েন্টের ব্যবসায়িক ধরন বিবেচনা না করে কিউআর স্থাপন করা হলে তা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বিপদে পড়তে পারেন সাধারণ গ্রাহকও

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সাধারণ গ্রাহকের জন্য। কারণ, অনেক গ্রাহক বাংলা কিউআর ও ক্যাশ আউটের পার্থক্য না বুঝেই দোকানির কথামতো লেনদেন করছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু টাকা পাঠিয়ে নগদ টাকা পাওয়ার একটি সহজ পদ্ধতি।

কিন্তু লেনদেনের রেকর্ডে সেটি ক্যাশ আউট হিসেবে নয়, মার্চেন্ট পেমেন্ট হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ওই লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গ্রাহককে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে—কেন কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেও তিনি ওই মার্চেন্টকে টাকা দিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এমএফএস সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা সীমিত ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া লাখ লাখ মানুষ এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা জমা, উত্তোলন ও স্থানান্তরের সুবিধা পাচ্ছেন।

তাই বাংলা কিউআরকে কেন্দ্র করে যদি অবৈধ ক্যাশ আউট ব্যবসা বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট বা এজেন্ট নয়, পুরো এমএফএস খাতই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে অপব্যবহারের অভিযোগে এজেন্ট হিসাব বন্ধ হওয়ার ঘটনা বাড়লে প্রান্তিক মানুষের আর্থিক সেবা পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলা কিউআর বন্ধ করা নয়, বরং এর অপব্যবহার ঠেকানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য এজেন্ট পয়েন্টে কিউআর স্থাপনের আগে ব্যবসার ধরন যাচাই, অস্বাভাবিক লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এবং পণ্য বা সেবা ছাড়াই পেমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা শনাক্তে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই নগদবিহীন লেনদেন বাড়ানোর এই উদ্যোগ অবৈধ ক্যাশ আউটের নতুন পথ হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা পাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত