২০১৭ সালে ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৭ হাজার ২৫২ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ২ হাজার ২০৭ জন প্রার্থী বাদ পড়েন। সেখান থেকে বিভিন্ন সময় অধিকাংশই সুযোগ পেলেও ৬৫ জন প্রার্থীকে ৯ বছরেও নিয়োগ দেয়নি এনটিআরসিএ। তাদের নিয়োগ দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা প্রতিপালন করেনি এনটিআরসিএ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদালতের রায় বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে বিষয়টি দীর্ঘায়িত করেছে এনটিআরসিএ। আপিল বিভাগের রিভিউ রায়ে তাদের অধিকার অক্ষুন্ন রাখার কথা স্পষ্টভাবে বলা হলেও তা বাস্তবায়নে এনটিআরসিএ সময়ক্ষেপণ করেছে। তারা ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিলেও এই ৬৫ জন বঞ্চিতই থেকে গেছে। এ নিয়ে এনটিআরসিএর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলাও চলছে।
মামলা সূত্র ও সুপ্রিম কোর্টের রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধনে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সরাসরি নিয়োগ না পাওয়ায় একদল প্রার্থী আদালতের দ্বারস্থ হন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি হাইকোর্ট হয়ে আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের দ্বারস্থ হলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ রিট আবেদনকারীদের পক্ষে রায় দেন। পরবর্তী সময়ে এনটিআরসিএ রিভিউ পিটিশন দায়ের করলে আপিল বিভাগ রিভিউ রায়ের চূড়ান্ত আদেশে একটি বিশেষ অনুচ্ছেদ যুক্ত করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ‘শিক্ষক নিবন্ধনে সাধারণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তির নিয়ম বহাল করা হলেও, মূল ২ হাজার ২০৭ জন রিট আবেদনকারীর (যার অন্তর্ভুক্ত এই ৬৫ জনের প্যানেল) রিভিউ সিদ্ধান্তটি মূল আবেদনকারীদের অনুকূলে পাওয়া পূর্বের সুবিধা বা রায়কে কোনোভাবেই ক্ষুণœ করবে না এবং এনটিআরসিএ তাদের আদেশ বাস্তবায়নে আইনিভাবে বাধ্য।’
এ নিয়ে সিভিল আপিল নম্বর ৩৪৩/২০১৯-সহ সংশ্লিষ্ট মামলার ধারাবাহিকতায় ১৩তম নিবন্ধনের রিটকারী প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় আসে। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ২০২১ সালের ৩য় গণবিজ্ঞপ্তিতে ২ হাজার ২০৭টি পদ সংরক্ষণ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগও ৩০ জুন ২০২১ তারিখে স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭৩.০৪.০১২.১৭-৩০৬-এর মাধ্যমে ওই পদে নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএকে সুপারিশ প্রদানের নির্দেশনা দেয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালতের নির্দেশে সংরক্ষিত ২ হাজার ২০৭টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই ৬৫ জনও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা অন্য প্রার্থীদের মতো অনলাইনে পছন্দক্রম দিয়ে আবেদনও সম্পন্ন করেন। কিন্তু এরপরও তাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়নি। এনটিআরসিএর পক্ষ থেকে তখন শূন্য পদ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় বলে দাবি প্রার্থীদের।
এদিকে ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট এনটিআরসিএর পরিচালক (উপসচিব) কাজী কামরুল আহছানের স্বাক্ষরে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে ৬৫ জন প্রার্থীর রোল নম্বর উল্লেখ করে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদগুলোর চাহিদা পাওয়া গেলে তাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ আবেদন নেওয়ার পর তাৎক্ষণিক সুপারিশ না করলেও ভবিষ্যতে শূন্য পদ পাওয়া গেলে তাদের সুপারিশ করার কথা জানায় এনটিআরসিএ। কিন্তু এরপর কেটে গেছে প্রায় ৫ বছর, এর মধ্যে কয়েকবার শিক্ষক নিয়োগ দিলেও তাদের বঞ্চিতই রাখে এনটিআরসিএ।
ইতিমধ্যে এনটিআরসিএ ৩য় গণবিজ্ঞপ্তির পর ৪র্থ ও ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে। কিন্তু ২০২১ সালের প্রজ্ঞাপনে তালিকাভুক্ত ৬৫ জনের নিয়োগের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা, তারা বলছেন, এনটিআরসিএ যখন নিজেই বলেছিল শূন্য পদ পাওয়া গেলে তাদের সুপারিশ করা হবে, তখন পরবর্তী গণবিজ্ঞপ্তিগুলোতে শূন্য পদ থাকার পরও কেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হলো না?
মামলা ও সুপ্রিম কোর্টের রায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রিভিউ রায়ে মূল ২ হাজার ২০৭ জন রিট আবেদনকারীর পূর্বে অর্জিত সুবিধা বা অধিকার ক্ষুন্ন না হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এর ফলে তাদের আইনি অবস্থান নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা থাকার কথা নয়। বরং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা এনটিআরসিএর দায়িত্ব।
আটকে গেছে জীবনের হিসাব : দীর্ঘ এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে নিয়োগ প্রার্থীদেরই। ২০১৭ সালে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সময় যাদের সামনে শিক্ষকতার ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ ছিল, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তাদের অনেকেরই এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স পেরিয়ে গেছে। ফলে নতুন করে গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগও অনেকের নেই। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা নতুন কোনো সুবিধা চান না। আদালতের রায়ে যে অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে এবং এনটিআরসিএ নিজস্ব প্রজ্ঞাপনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটির বাস্তবায়ন চান তারা।
১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন নিয়ে রিট আবেদনকারী ভুক্তভোগী শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একদিকে এনটিআরসিএ মামলা দিয়ে আমাদের নিয়োগ আটকে রেখেছে এবং সময়ক্ষেপণ করেছে। অন্যদিকে আদালতের রায় যখন আমাদের পক্ষে এলো তখন এনটিআরসিএ অজুহাত দেখাল যে, আমাদের নিবন্ধন সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ রায়ের পর্যবেক্ষণে আমাদের এ সংক্রান্ত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আমরা আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত আপিল বিভাগে জয়ী হয়ে এবং ৩য় গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়ম মেনে চয়েস দিয়ে আবেদনের পরেও এনটিআরসিএ আমাদের নিয়োগ সুপারিশ আটকে রেখেছে। তারা প্রজ্ঞাপন জারি করে পদ খালি পাওয়া মাত্র আমাদের ৬৫ জনকে নিয়োগের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু এরপর আরও তিনটি গণবিজ্ঞপ্তিতে লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়োগ দিলেও আমাদের নিয়োগ দেয়নি। তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করেনি। এমনকি আদালতের নির্দেশও মানেনি। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৯ বছর আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের চাকরির বয়স পার হয়ে গেছে। পরিবার ও সমাজের কাছে আমরা আজ চরম লাঞ্ছিত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের অবিলম্বে পদায়নের ব্যবস্থা করে পরিবারগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ।
আরেক রিট আবেদনকারী ভুক্তভোগী শিক্ষক শাহপরানী মুন্নী দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন নারী হিসেবে দীর্ঘ ৯ বছর আইনি লড়াই আর প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো কতটা যে যন্ত্রণা আর লাঞ্ছনার, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের করুণা আর অবহেলার পাত্রী হয়ে আজ আমরা হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা পেরিয়ে আমরা দিশেহারা। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং এনটিআরসিএর দেওয়া প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব মহোদয় যেন আমাদের মতো নারী শিক্ষকদের মানবিক দিকটি বিবেচনা করেন।
আদালত অবমাননার মামলাও চলছে : রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যে এনটিআরসিএর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। ঈড়হঃবসঢ়ঃ চবঃরঃরড়হ ঘড়. ৫৩/২০২৪ নামে মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে চলমান রয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে পাঠালেও তিনি রেসপন্স করেননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নেব। যদি তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয় কিংবা আদালতের রায় তাদের পক্ষে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগে জটিলতা কোথায় এ বিষয়টি ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। বর্তমান সরকার শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক।