দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান এবং অতিরিক্ত আমদানি-নির্ভরতার কারণে দেশে যে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে বর্তমান সরকার এক বহুমুখী ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই আশাবাদ ও সরকারের রূপরেখা ব্যক্ত করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, অতীতে সময়মতো ভূগর্ভস্থ সম্পদের সঠিক অনুসন্ধান না করা এবং বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলেই মূলত আজকের জ্বালানি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং শিল্প ও আবাসিক খাতের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে দেশীয় সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং একই সাথে অবকাঠামোগত সংস্কারকেই মূল স্তম্ভ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদে সরকারের নেওয়া বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রথমত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে ১৫০টি নতুন কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের এক সুবিশাল কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যেতে শুরু করেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে, যার মাধ্যমে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস নতুন করে জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আরও ৭টি কূপে জোরকদমে খননকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা সম্পন্ন হলে গ্রিডে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সংযুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্যও পর্যায়ক্রমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে।
দ্বিতীয়ত, নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক জরিপ শেষ করার প্রস্তুতি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ জরিপের ফল দেশের অনাবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অবস্থান চিহ্নিতকরণে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স-কে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) আরও আধুনিক ও সামর্থ্যবান করে গড়ে তুলতে নতুন ২টি অত্যাধুনিক রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। এর ফলে দেশীয় সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে ত্বরান্বিত গতিতে গ্যাস আহরণ সম্ভব হবে।
চতুর্থত, অফশোর ও অনশোর খাতের সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে বড় বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান (বিড রাউন্ড) ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ‘অনশোর মডেল পিএসসি’ চূড়ান্তকরণের অনুমোদন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এখান থেকে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তায় তা বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
পঞ্চমত, আমদানিকৃত গ্যাস পুন প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহী আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে বর্তমানে আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালু হবে এবং এর মাধ্যমে দেশে এলএনজি সরবরাহ দৈনিক ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে।
একই সাথে পায়রা, মোংলা বা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জরুরি প্রয়োজনে আরও ১-২টি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এ সকল বহুমুখী পদক্ষেপ চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ় হবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।
জ্বালানি সংকট নিরসন ও জননিরাপত্তা নিয়ে জনরাষ্ট্র আন্দোলনের উদ্বেগ
জ্বালানি সংকট ১৭ বছরের উত্তরাধিকার: রাশেদ তিতুমীর