সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

সম্পত্তি লাভের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারা অনুযায়ী, ‘Gift’ বলতে কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও বিনা প্রতিদানে কোনো বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করাকে বোঝায়, যা দানগ্রহীতা বা তার পক্ষে কেউ গ্রহণ করেন। যে ব্যক্তি সম্পত্তি হস্তান্তর করেন তাকে ‘দাতা’ এবং যিনি গ্রহণ করেন তাকে ‘দানগ্রহীতা’ বলা হয়।

দান গ্রহণের ক্ষেত্রে দাতা জীবিত থাকা এবং দান করার সক্ষমতা থাকা অবস্থায় দান গ্রহণ করতে হয়। দান গ্রহণের আগে দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে দান বাতিল হয়ে যায়।

সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতাকে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে দেওয়ার ঘোষণা বা প্রস্তাব দিতে হয়। গ্রহীতা বা তার পক্ষে কেউ সেই সম্পত্তি গ্রহণ করবেন এবং দান করা সম্পত্তির দখল বা মালিকানা গ্রহীতার কাছে আইনগতভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।

তবে মৌখিক দানের ক্ষেত্রে দালিলিক প্রমাণ না থাকায় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি হতো। এসব জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২৫ নম্বর আইন অনুযায়ী, ৭ ডিসেম্বর ২০০৪ সালের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১ জুলাই ২০০৫ সাল থেকে মুসলমানদের জন্য কতিপয় সম্পর্কের মধ্যে হেবার ঘোষণাপত্র দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ৪১ নম্বর আইন অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর ২০১২ সালের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৭ অক্টোবর ২০১২ সাল থেকে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের জন্য কতিপয় সম্পর্কের মধ্যে দানের ঘোষণাপত্র দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়।

স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-এর তফসিল-১-এর দফা ৩২(i) অনুযায়ী হেবার ঘোষণা ও দানের ঘোষণাপত্র দলিলের স্ট্যাম্প ডিউটি এবং একই আইনের তফসিল-১-এর দফা ৩২(ii) অনুযায়ী দানপত্র দলিলের স্ট্যাম্প ডিউটি আদায় করা হয়।

এদিকে, ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারায় নতুন করে ১২২এ ও ১২২বি ধারা সন্নিবেশ করা হয়েছে। এতে ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’-এর নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে।

নতুন ১২২এ ধারায় বলা হয়েছে, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দানের মাধ্যমে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ করা হলে তা বৈধ বলে গণ্য হবে। এ ধরনের দান কোনো পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি/নানা-নানি কর্তৃক তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে অথবা বিপরীতক্রমে সন্তান বা নাতি-নাতনি কর্তৃক পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি/নানা-নানিকে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে করা যাবে।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের দান রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর ১৭(১)(ক) ধারার অধীনে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এবং ১২২এ ধারার অধীন ঘোষণার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, দাতার জীবদ্দশায় দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তিটি আইন অনুযায়ী দানগ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। তবে দাতার ভোগ-দখলের অধিকার বহাল থাকবে এবং তা সম্পত্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

এ ছাড়া ১২২এ ধারার অধীন হস্তান্তরকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের আওতায় একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি প্রচলিত দান, হেবা বা অন্য কোনো আইনস্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত বা প্রভাবিত করবে না।

১২২বি ধারায় ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দানের প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের বিধান রাখা হয়েছে। এ ধারার অধীন নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় হবে। তবে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে ওই দানের অধীনে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, প্রত্যাহার বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করা যাবে।

কোনো পক্ষ নাবালক, নিখোঁজ, মানসিক ভারসাম্যহীন, আইনগতভাবে অক্ষম বা অন্য কোনো যথার্থ কারণে সম্মতি দিতে না পারলে জেলা জজ অপর পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তির অনুমোদন দিতে পারবেন। এ ধরনের আদেশ দেওয়ার আগে জেলা জজ সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তিকে নোটিশ দেবেন, প্রয়োজনীয় তদন্ত করবেন এবং আবেদনটি সরল বিশ্বাসে করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করবেন।

হেবার ঘোষণাপত্র, দানের ঘোষণাপত্র ও দানপত্রের মাধ্যমে সম্পত্তি নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে দানগ্রহীতা সম্পত্তির মালিক হয়ে যান এবং নিজের নামে নামজারি করে তা অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। তবে ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান করা হলে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় দানগ্রহীতা সম্পত্তির নিরঙ্কুশ মালিক হবেন না এবং দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন না।

নিবন্ধন কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, বয়স্ক কোনো ব্যক্তি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পর ওই সন্তান বা নাতি-নাতনি তাকে অবহেলা করেন। কখনো তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, আবার কখনো দান করা সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে বৃদ্ধ দাতা দলিল বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের দ্বারস্থ হন। তবে সাব-রেজিস্ট্রারের দলিল নিবন্ধনের ক্ষমতা থাকলেও নিবন্ধিত দলিল বাতিলের ক্ষমতা নেই। দলিল বাতিলের ক্ষমতা আদালতের।

নতুন ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ পদ্ধতিতে সম্পত্তি নিবন্ধনের সুযোগ থাকায় বয়স্ক দাতাদের অধিকার আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।

নিবন্ধনসংশ্লিষ্টদের মতে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন একটি যুগোপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নতুন এ বিধান কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে ব্যক্তি তার ইচ্ছা ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রচলিত হেবার ঘোষণাপত্র, দানের ঘোষণাপত্র, দানপত্রের পাশাপাশি ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ পদ্ধতিতেও সম্পত্তি নিবন্ধন করতে পারবেন।

হেবার ঘোষণাপত্র দলিল মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ্)-এর অধীন কতিপয় সম্পর্কের মধ্যে হয়ে থাকে। দানের ঘোষণাপত্র দলিল হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের ব্যক্তিগত আইনের অধীন কতিপয় সম্পর্কের মধ্যে হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ বিষয়ক নতুন দলিল সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে করা যাবে।

এতে প্রচলিত সাধারণ দান (Gift), মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্র (Heba or Declaration of Heba) কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্র আগের মতোই বহাল থাকবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারায় ১২২এ ও ১২২বি ধারা সন্নিবেশকে যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে এ উদ্যোগের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর প্রতি বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত