স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে একাধিক বিকল্প ভেবে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। ক্ষমতাসীন থাকার সর্বশেষ দেড় দশকে দলীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা ব্যক্তিকে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে গুরুত্ব দেবে আওয়ামী লীগ। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়েও পরিকল্পনা আছে দলটির। দলীয় পদ-পদবিধারী নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনের কোনো পর্যায়ে প্রার্থী হতে আপাতত নিরুৎসাহিত করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মূল লক্ষ্য বিজয় অর্জন নয়, বরং কার্যকরী ইস্যূ বের করে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় নির্বাচন হবে সে কারণে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হলে ‘আওয়ামী লীগার’দের নির্বাচনের বাইরে রাখা বিএনপির জন্য কঠিন হবে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন যেহেতু হবে না সে কারণে নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগকে আটকানোর সুযোগ কম। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার আওয়ামী লীগের পদ-পদবিধারী কাউকে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে দেবে না এটা ধরেই নিয়েছে দলটি। দলের পদ-পদবিধারী প্রার্থীকে ভোটে বিরত রাখতে মব করবে, মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠাবে, মোট কথা, ভোটের মাঠে থাকতে দেবে না বিএনপি। এসব ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে থাকবে। তাই পদ-পদবিধারী নেতাদের আপাতত ভোট করতে দেবে না আওয়ামী লীগ।
ওই নেতারা আরও বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হবে এমন ব্যক্তি যার পদ-পদবি নেই; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের, পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত, প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিতে আপসহীন। ইতিমধ্যে সেরকম একটি তালিকাও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব চূড়ান্ত করেছে, দাবি করেন কার্যক্রম-নিষিদ্ধ দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে। কাদের প্রার্থী করা হবে তারও চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে ভোটের মাঠে নামার সুযোগ হয়তো নেই। তাই পদ-পদবিধারী নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনের মাঠে নামাবে না আওয়ামী লীগ। পদ-পদবি নেই, রাজনীতিতেও নিষ্ক্রিয় কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের, বংশগতভাবে আওয়ামী লীগ পরিবারের প্রার্থীদের ভোট করার নির্দেশনা দেওয়া হবে। স্থানীয়ভাবে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, ভাবমূর্তি আছে, স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, সমাজসেবী-দানশীল, শিক্ষিত-মার্জিত প্রার্থীকে ভোটে নামাবে আওয়ামী লীগ। একঝাঁক তরুণ প্রার্থীকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ও ষাটের-সত্তরের দিকে আওয়ামী লীগ করা পরিবারগুলোর সন্তান এবং স্বজনরা অগ্রাধিকার পাবেন। ৫ আগস্টের পরে স্থানীয়ভাবে টিকে থাকা পরিবারগুলো থেকেও স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থী হতে উদ্বুদ্ধ করবে আওয়ামী লীগ।’
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাবে সেই ব্যক্তি যিনি ৫ আগস্টের পরে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার সাহস দেখিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় কিন্তু আওয়ামী লীগ-পরিবারের সন্তান। তিনি বলেন, কারা স্থানীয় নির্বাচন করবেন ইতিমধ্যে সেসব প্রার্থীর সঙ্গে দলীয় সভাপতির যোগাযোগ হয়েছে। তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এ সদস্য আরও বলেন, সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১০ হাজার প্রার্থীর একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ভোট করবেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে; স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়। এ দুটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি প্রার্থী ঘোষণা করা হবে না। আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের নির্বাচন করার সুযোগও নেই। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কারা, কারা বংশগতভাবে আওয়ামী লীগার, চিন্তা-চেতনায় প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সেটি ধরে আওয়ামী লীগ একটি তালিকা করেছে। সে তালিকা ধরে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট করতে নির্দেশনা দেওয়া হবে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সবাইকে তার পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেবেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আরাফাত এ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে সব রকমের প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ নিয়ে রেখেছে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হবে, ফলে আওয়ামী লীগকে আটকানোর সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিকল্প আওয়ামী লীগার আছে। কারা প্রার্থী হবেন, কারা হবেন না সে ব্যাপারেও ভেবে রেখেছে আওয়ামী লীগ।’