ভবন বিক্রি থেকে জমি লিজ- ঝাউপাড়া মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়মের দীর্ঘ তালিকা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম

একটি-দুটি নয়- ভবন বিক্রি, জমি লিজ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, আর্থিক হিসাব, পদায়ন ও শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণ- নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ঝাউপাড়া দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল গনির বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অভিযোগ। এসব অভিযোগের কিছু ইতোমধ্যে প্রশাসনের নজরেও এসেছে। তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

তবে অভিযোগগুলোর সবকটির সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, লিখিত জবাব ও নথিপত্র যাচাইয়ের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাদ্রাসার প্রায় ৯০ ফুট দীর্ঘ একটি সেমিপাকা ঘর, ৪৫ ফুট টিনশেড এবং প্রায় ১০ ফুটের আরেকটি স্থাপনা ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল গনি দাবি করেছেন, মাদ্রাসার আগের কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব স্থাপনা সরানো হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন তিনি দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার ৩৭ শতাংশ ফসলি জমি সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় কট দেওয়া, সোয়া আট শতাংশ লিচুবাগান ৩৮ হাজার টাকায় লিজ দেওয়া এবং আরও কিছু জমি ইজারা দেওয়ার হিসাব যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। আব্দুল গনির নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৯৫ সালের ১২ জুলাইয়ের একটি নিয়োগপত্রে তাঁকে সহ-সুপার/সিনিয়র মৌলভী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে দুই পদে নিয়োগের বিধান এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক মাহফুজুর রহমানের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁকে বিভিন্ন সময়ে এমন পদে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ বিষয়েও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক বলেন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। পরে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

মাদ্রাসার সাবেক সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, তিনি অ্যাডহক কমিটির দায়িত্বে থাকাকালে ভবন বিক্রি বা জমি লিজ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানপ্রধান কোনো অনিয়ম করে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল গনি বলেন, তিনি যা করেছেন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই করেছেন। নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার পর পুরোনো ভবন ভাঙা হয়েছে এবং জমি লিজের অর্থে মাদ্রাসার জন্য জায়গা কেনা হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম আকতার বলেন, ভারপ্রাপ্ত সুপারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর নথিপত্র যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভবন, জমি আর হিসাবের খাতা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও একটি এলাকার আস্থা। সেই আস্থার জায়গায় যখন একের পর এক প্রশ্ন জমে, তখন উত্তরও হতে হয় স্পষ্ট। ঝাউপাড়া দাখিল মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এখন সেই উত্তর খুঁজছে প্রশাসন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত