বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে র‍্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘মন খুলে কথা বলি, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে র‍্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সিএসডব্লিউএবি)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের (আইএসডব্লিউআর) ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সিএসডব্লিউএবি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্‌মিনা আখতার। অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাহিন খানসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক তাহ্‌মিনা আখতার বলেন, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, মানসিক চাপ ও সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষ নিজেকে অসহায় ও বিচ্ছিন্ন মনে করলে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে বিচার না করা এবং প্রয়োজনের সময়ে যথাযথ সহায়তার ব্যবস্থা করা।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আত্মহত্যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত। এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি আত্মহত্যার ঘটনা পরিবার, স্বজন এবং বৃহত্তর সমাজের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবনের অতিরিক্ত চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রতিকূল জীবনপরিস্থিতি এবং প্রাণঘাতী উপকরণের সহজলভ্যতা—বিভিন্ন বিষয় সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় কিশোর-তরুণ, শিক্ষার্থী, নারী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির প্রবণতা দেখা গেছে। তবে হাসপাতাল, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমনির্ভর তথ্যের ওপর অধিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

অধ্যাপক তাহ্‌মিনা আখতার বলেন, ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন, স্বল্পমেয়াদি বা প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।’

এ লক্ষ্যে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্যকর জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম জোরদার করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যায়েই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, তাদের শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিয়মিত অনুসরণ। একই সঙ্গে পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি, সহিংসতা প্রতিরোধ, দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদন নিশ্চিত করা এবং প্রাণঘাতী উপকরণের সহজ প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘কেউ যখন জীবনের সংকটে পড়েন, তখন তাকে উপদেশ দেওয়ার আগে তার কথা শুনতে হবে। তাকে একা না রেখে পাশে দাঁড়াতে হবে। একটি সহানুভূতিশীল কথোপকথন, মনোযোগ দিয়ে শোনা কিংবা সময়মতো একজন পেশাজীবীর কাছে পৌঁছে দেওয়া—কখনো কখনো একটি জীবন বাঁচানোর কারণ হতে পারে।’

তিনি আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, দুর্বলতা কিংবা অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক তাহ্‌মিনা আখতার বলেন, ‘আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ তার কষ্টের কথা বলতে ভয় পাবে না, সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করবে না এবং সংকটের মুহূর্তে তাকে একা থাকতে হবে না। মন খুলে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে আত্মহত্যা প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।’

তিনি আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রতি সহমর্মী আচরণ এবং সময়মতো পেশাগত সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত