কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কপালে ভাঁজ

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

দেশের অন্যতম শীর্ষ আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাটে হিমাগারে আলু রেখে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়ার ধকল সামলাতে গিয়ে প্রতি বস্তায় তাদের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে আলু বিদেশে রপ্তানি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এদিকে, আলু চাষিদের এই ক্ষতি কাটাতে নানা ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের অন্যতম জেলা জয়পুরহাটের মাটি ও আবহাওয়য়া ভালো থাকায় এখানকার আলুর বাম্পার ফলন হয়। ফলন ভালো হলেও হিমাগারে আলু রেখে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। বছরের পর বছর আলু চাষ করে লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ আর হিমাগারের ভাড়াই তুলতে পারছেন না তারা। জেলায় এবার ৯ লাখ ৪৩ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। এখানকার ২২টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টন আলু মজুদ রাখার মধ্যে, হিমাগারগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৩১ শতাংশ আলু উত্তোলন হয়েছে।  সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরিসহ ৬০ কেজির প্রতি বস্তা আলুতে প্রকারভেদে ও জাত অনুযায়ী খরচ পড়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে প্রকারভেদে ও জাত অনুযায়ী হিমাগার গেটে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৮৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। এতে কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত। গতবারের লোকসান কাটিয়ে একটু লাভের আশায় স্থানীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ বা কর্জ নিয়ে আলু চাষ করেছেন তারা। এতে একদিকে আলুতে লোকসান, অন্যদিকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তাদের স্বপ্ন এখন গুড়েবালি। এদিকে হিমাগারে সারি সারি বস্তা সংরক্ষণের মেয়াদ ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। যত দিন ঘনিয়ে আসছে, তত আলুর বাজার কমছে। এতে হতাশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ধারাবাহিক লোকসান ঠেকাতে আলু বিদেশে রপ্তানি ও সরকারি সহযোগিতা চান তারা।

কালাই উপজেলার আওড়া গ্রামের ব্যবসায়ী খাজের আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিমাগারে ২৫শ বস্তা আলু রেখেছি। প্রতি বস্তাতে খরচ পড়েছে ১ হাজার ২২২ টাকা। এখন সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা বস্তা। অনেক টাকা লোকসান হবে। প্রচুর আলু আছে, বিদেশে রপ্তানি করলে ভালো হয়। খরচটাও যদি তুলতে পারতাম, তাও ব্যবসাটা ধরে রাখতে পারতাম।

বানিহারা গ্রামের কৃষক সোহাগ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো লোকসান হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে গেলে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়। আর তা বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকায়। আমরা কৃষকদের বছরের পর বছর এভাবে লোকসান হলে আমরা কীভাবে বাঁচব? ক্ষেতলাল উপজেলার দাশরা গ্রামের মোতালেব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলু উৎপাদনের সময় এক কেজি বীজ কিনতে গেলে ৮০ টাকা পড়ে। আর এখন আলু বিক্রি করছি ১৩-১৫ টাকা কেজি। ১ হাজার ৫০ টাকার সার ১ হাজা ৮০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চড়া দামে কিনতে হয়। তাহলে আমরা কৃষকরা কীভাবে বাঁচব? চিন্তা করছি আগামীতে আর আলুর চাষই করব না।

কালাইয়ের তালোরা বাইগুনি গ্রামের ইমরান হোসেনসহ অনেক শ্রমিক জানান, আমরা গরিব মানুষ হিমাগারে শ্রমিকের কাজ করে খাই। কিন্তু আলুর দাম কম হওয়ায় আলু উত্তোলন হচ্ছে না, আমাদের কাজ নাই। কাজ না থাকলে কীভাবে আমরা দিনমজুররা চলব? এভাবে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা অনেক কষ্ট হচ্ছে। সরকার যদি আলুর দাম বাড়ায় বা বিদেশে রপ্তানি করে তাহলে আমরা শ্রমিকরা খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারব।

কালাইয়ের পুনট এলাকার এম ইশরাত হিমাগারের ম্যানেজার রায়হান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে আমাদের হিমাগার গেটে ৬০ কেজির বস্তা ৮৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি পাকড়ি আলু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকদের লোকসান হচ্ছে। আমার হিমাগার থেকে ৩১% আলু উত্তোলন হয়েছে। হিমাগার ভাড়াও গত বছরের থেকে ৭৫ পয়সা কমিয়ে প্রতিকেজি ৬ টাকা হারে নেওয়া হচ্ছে। দাম কম হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন করছেন না। ১০ নভেম্বর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব আলু উত্তোলন না হলে আমরাও চরম সমস্যাই পড়ব। যেমন বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিক খরচসহ হিমাগারসংশ্লিষ্টদেরও লোকসান গুনতে হবে।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান হিমাগার থেকে প্রায় ৩১% আলু উত্তোলন হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। আলুর দাম কম হওয়ায় কৃষকের লোকসান হচ্ছে। কৃষকরা যাতে আলুর দাম ভালো পায় এ জন্য আমরা ভাল জাতের আলু উৎপাদনে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত