অসংক্রামক ব্যাধি রোধে এফওপিএল: বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?

সব ধরনের ভোক্তা যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এটাই এফওপিএল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্তমানে অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে ছোট অক্ষরে, প্যাকেটের পেছনে অথবা সংখ্যাভিত্তিক হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার কাছে সহজবোধ্য হয় না।

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশেই যদি লেখা থাকে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ কিংবা ‘অতিরিক্ত চর্বি’, তাহলে খাবার কেনার আগে একজন ভোক্তা সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন পণ্যটি তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধারণা থেকেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং বা এফপিএল। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের একটি ব্যবস্থা চালুর আলোচনা চলছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৬ সালের খসড়া প্রবিধানকে ঘিরে সেই আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।

গত ২৬ জানুয়ারি বিএফএসএ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে মতামত আহ্বান করে। খসড়ায় তফসিল-১ এ প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ/সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা সহজে বোঝানোর জন্য সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। খসড়াটি নিয়ে মতামত দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি।

কিন্তু মতামত গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর খসড়াটির প্রশাসনিক ও নীতিগত যাত্রাপথ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে এখন সেটিই হয়ে উঠেছে এফওপিএল বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রকাশ্য নথি ও পরবর্তী বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যায়, মতামত গ্রহণের পরও খসড়াটির প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। মার্চে খসড়াটির ‘হারমোনাইজকৃত’ সংস্করণ নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে বিএফএসএ -এর নথিতে মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিংয়ের পূর্ববর্তী খসড়ার বিষয়ও দেখা যায়। অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারির পর খসড়াটি পরবর্তী প্রশাসনিক ও কারিগরি যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।

এরপর আসে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ। প্রকাশিত সংবাদে বিএফএসএ -এর সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েবের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে খসড়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অর্থাৎ জনমত ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণের পর বিএফএসএ পর্যায়ের প্রক্রিয়া শেষ করে প্রবিধানটির খসড়া মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফাইলটির গতিপথ এখনো প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্ট নয়। কোন পর্যায়ে এটি পর্যালোচনা হয়েছে, কোন কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এতে মতামত দিয়েছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া অংশীজনদের আপত্তি ও প্রস্তাবের কোনগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং খসড়ার কোন কোন ধারা পরিবর্তিত হয়েছে এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো জনসমক্ষে নেই।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আগস্টে। ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এফওপিএল -এর খসড়া তখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং বিষয়টি অপেক্ষাধীন অবস্থায় রয়েছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বছরের শুরুতে এফওপিএল হিসেবে সতর্কতামুলক লেবেলিং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মিটিং এ আলোচনা হয়েছিল। অর্থাৎ এফওপিএল-এর সতর্কতামূলক চিহ্নের নকশা নিয়ে অগ্রগতি থাকলেও পুরো প্রবিধানটি তখনো গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি।

অন্যদিকে বিএফএসএ -এর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক এফওপিএল -এর খসড়া দ্রুত চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে চূড়ান্তকরণের পথে বাধাটি আসলে কোথায়? এই পর্যায়ে অনুসন্ধানের কেন্দ্রে আসছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নথি ২৬ জানুয়ারির মূল খসড়া, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া মতামত, মার্চের সমন্বিত খসড়া এবং ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সংস্করণ।

এই চারটি নথি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা গেলে বোঝা সম্ভব হবে, মতামত গ্রহণের পর খসড়াটির কোথায় কোথায় পরিবর্তন এসেছে এবং কোন প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে আছে। বিশেষ করে বিএফএসএ -এর টেকনিক্যাল কমিটির বিভিন্ন মিটিংএ শিল্পখাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি, দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক বাস্তবায়নের দাবি, ছোট প্যাকেটের ক্ষেত্রে ছাড়ের প্রস্তাব এবং ডব্লিউটিও বিজ্ঞপ্তি -সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো খসড়ার পরবর্তী সংস্করণে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না তা নথিপত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং এফওপিএল নিয়ে অনুসন্ধানের প্রশ্ন এখন শুধু ‘খসড়ায় কী আছে’ এতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বড় প্রশ্ন হলো, ১৫ ফেব্রুয়ারি মতামত গ্রহণের পর খসড়াটি কোন কোন প্রশাসনিক টেবিল অতিক্রম করেছে, প্রতিটি পর্যায়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের ফলে খসড়ার কাঠামো কতটা বদলেছে বা বদল হয়নি। কেন, কোথায় আটকে আছে? যদিও প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় বিএফএসএ পক্ষের পরিকল্পনায় ছিল।

এই ফাইলের গতিপথ প্রকাশ করা গেলে একদিকে যেমন বোঝা যাবে চূড়ান্তকরণে বিলম্বের কারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নাকি নীতিগত মতবিরোধ, অন্যদিকে স্পষ্ট হবে অংশীজনদের আপত্তি ও প্রস্তাব এফওপিএল -এর চূড়ান্ত কাঠামোতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে প্যাকেটের সামনে, সহজ ভাষায় চোখে পড়ার মতো করে সতর্কীকরণ বক্তব্য যা সহজে বোধ্যগম্য এবং অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।

সব ধরনের ভোক্তা যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এটাই এফওপিএল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্তমানে অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে ছোট অক্ষরে, প্যাকেটের পেছনে অথবা সংখ্যাভিত্তিক হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার কাছে সহজবোধ্য হয় না।

বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং নিয়ে অবশ্য এই প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১৭ সালের ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা’র খসড়া তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় এক দশক ধরে প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং নিয়ে নীতিগত আলোচনা চললেও খসড়াই থেকে গেছে। এফওপিএল নিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগের পেছনে বাংলাদেশের পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস ও অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা বড় কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। এসব মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে অকালভাবে। হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো রোগগুলো দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বির ব্যবহার এসব রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের পুষ্টিগত ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। ৯৭৪ জন মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী গবেষণার আগের সপ্তাহে অন্তত একটি প্রক্রিয়াজাত বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেছিলেন।

গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি খাদ্যপণ্যের ৬৩ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সোডিয়াম বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি সোডিয়াম পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় কিছু পণ্যের লেবেল ও পরীক্ষিত সোডিয়ামের মাত্রার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতিও পাওয়া যায়। এমনকি কিছু পণ্যে সোডিয়াম সম্পর্কে কোনো তথ্যই দেওয়া ছিল না। এই বাস্তবতায় এফওপিএল-এর পক্ষে যুক্তি হচ্ছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এর ২০২৫ সালের একটি জরিপ এর তথ্য মতে, সামনের অংশে সতর্কতা চিহ্ন থাকলে ক্রেতা পন্য কেনার সময় সহজে অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

এখানেই জিডিএ বা নির্দেশিকা দৈনিক পরিমাণ এবং সামনের সতর্কতা চিহ্নের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। জিডিএ পদ্ধতিতে একজন ভোক্তাকে পণ্যে থাকা চিনি, লবণ, চর্বি কিংবা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পরিমাণকে দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর জন্য কিছুটা সংখ্যাজ্ঞান ও পুষ্টি-সংক্রান্ত ধারণা প্রয়োজন। বিপরীতে সামনের সতর্কতা চিহ্ন তুলনামূলকভাবে সরল। একটি বড় ও স্পষ্ট প্রতীক দেখে ভোক্তা বুঝতে পারেন কোনো একটি পুষ্টি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় রয়েছে কি না। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সব শ্রেণির মানুষের পুষ্টি-সংক্রান্ত জ্ঞান সমান নয়, সেখানে এই সরলতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সতর্কতা চিহ্ন বিশেষ করে কম শিক্ষিত বা সীমিত পুষ্টি-জ্ঞানসম্পন্ন ভোক্তাদের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

তবে এফওপিএল-এর প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে আপত্তিও কম নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন আলোচনায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নে খাদ্য উৎপাদকদের অতিরিক্ত ব্যয় হবে। প্যাকেটের নকশা পরিবর্তন, নতুন মোড়ক তৈরি, পুরোনো প্যাকেটের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়তে পারেন। ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করে, সতর্কতামূলক লেবেলের পরিবর্তে জিডিএ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত।

একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার আগে দীর্ঘ সময়ের একটি স্বেচ্ছামূলক পর্যায় রাখার প্রস্তাবও এসেছে। সংশ্লিষ্ট চিঠিপত্র ও আলোচনার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত পাঁচ বছর স্বেচ্ছামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ছোট প্যাকেটের জন্য ছাড়, কোডেক্স এবং বিএসটিআই -এর বিদ্যমান মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে শিল্প, সরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও আলোচনা করার দাবিও রয়েছে।

এই পাঁচ বছরের প্রস্তাব নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশ্ন, খাদ্যশিল্প যখন ঈদ, পূজা, পয়লা বৈশাখ কিংবা নতুন বাজারজাতকরণের সময় নিয়মিত প্যাকেটের নকশা ও স্টিকার পরিবর্তন করে থাকে, তখন একটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাস্তবায়নে পাঁচ বছর সময় কেন প্রয়োজন হবে? তাদের মতে, শিল্পের বাস্তব ব্যয় ও রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ স্বেচ্ছামূলক সময় যেন বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার কারণ না হয়।

এফওপিএল নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হচ্ছে ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়া হলে নীতিটির উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কারণ কম দামের ছোট প্যাকেটের খাদ্যপণ্য শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে সহজলভ্য। পণ্যের আকার ছোট হলেই তার মধ্যে থাকা অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বির স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায় না। একটি দেশ জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য খাদ্যপণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, তবে সেই ব্যবস্থা বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তাই ডাব্লিউটিও নোটিফিকেশন নিয়ে কোনো বাস্তব ঘাটতি থাকলে সেটি সংশোধন করা যেমন জরুরি, তেমনি ডাব্লিউটিও -এর নিয়মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্য নীতি অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এফওপিএল -এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে সামনের প্যাকেটে সতর্কতা চিহ্ন ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, খাদ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি ভোক্তার সামনে সরাসরি তুলে ধরার জন্য বড় ও সহজবোধ্য সতর্কতা চিহ্ন একটি কার্যকর নীতিগত হাতিয়ার হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনো দেশের মডেল সরাসরি কপি না করে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, বাজার কাঠামো, ভোক্তার আচরণ এবং উৎপাদকদের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সতর্কতা চিহ্নের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের পুষ্টি-মান নির্ধারণে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যবহার করা হবে। চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বির পাশাপাশি সোডিয়াম, কৃত্রিম মিষ্টি বা অন্যান্য উপাদান কীভাবে বিবেচনায় আসবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ ‘লবণ’ এবং ‘সোডিয়াম’ একই বিষয় নয়। একজন ভোক্তার কাছে ‘লবণ’ সহজবোধ্য হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে সোডিয়ামের পরিমাণ খাদ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এফওপিএল কোনো খাদ্যপণ্য নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নয়। এর উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাকে তথ্য দিয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। একটি পণ্য বাজারে থাকবে কি না, তা নয়; বরং পণ্যটি কেনার আগে ভোক্তা যেন তার পুষ্টিগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন এটাই মূল বিষয়।

খাদ্যশিল্পের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো প্রয়োজন। একদিকে শিল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তথ্য জানার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদের।

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এফওপিএল -এর খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও শিল্পপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। জুনের শেষ দিকে খসড়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু এখন হওয়া উচিত সরকারি ফাইলের গতিপথ। বিএফএসএ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফাইলে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কী বক্তব্য এসেছে, শিল্পসংগঠনগুলোর লিখিত প্রস্তাবের কোন অংশ বিবেচনা করা হয়েছে এবং খসড়ার কোন সংস্করণ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাঁচ বছরের স্বেচ্ছামূলক বাস্তবায়নের প্রস্তাব কি কেবল শিল্পের একটি মতামত হিসেবেই রয়েছে, নাকি সেটি সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। একইভাবে ডাব্লিউটিও নোটিফিকেশন নিয়ে আপত্তি বাস্তব কারিগরি সমস্যা, নাকি বাস্তবায়নের সময় বাড়ানোর যুক্তি সেটিও নথি বিশ্লেষণ ছাড়া বলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা যখন ক্রমেই বাড়ছে এবং দেশের বাজারে প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারও ব্যাপক, তখন প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগত তথ্যকে আরও সহজবোধ্য করার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নতুন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিল্পের যৌক্তিক উদ্বেগও শুনতে হবে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি এমন হতে হবে, যেখানে কোনো পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা আন্তর্জাতিক চাপ এককভাবে নীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে না। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা এই চারটি বিষয়কে ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ প্যাকেটের সামনে একটি কালো অষ্টভুজ হয়তো দেখতে ছোট একটি চিহ্ন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একজন ভোক্তা কী কিনবেন, কী খাবেন এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন সেই বড় প্রশ্ন।

এখন দেখার বিষয়, সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত প্যাকেটের সামনে জায়গা পায়, নাকি নীতিনির্ধারণের ফাইলেই আটকে থাকে।

 

  • লেখক: প্রোগ্রাম অফিসার (মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর, ঢাকা আহছানিয়া মিশন।
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত