তুলোর পাহাড়

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ এএম

আকাশটা আজ অন্যরকম। রুহির কাছে বেশ নতুনই লাগছে। এর আগে কখনো এমনটি দেখেনি। দেখবে কী করে? আগের বাসা থেকে তো ঠিকভাবে আকাশই দেখা যেত না।

রুহির বাবার অফিস নতুন এলাকায় এসেছে। তাই এখানে নতুন বাসায় উঠেছে। এলাকাটা শহর হলেও আশপাশ বেশ খোলামেলা। দশতলার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনটা ভরে যায়। ফুরফুরে বাতাস। সবুজ গাছগাছালি, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি সব পরিষ্কার দেখা যায়। বাসাটা রুহির খুব পছন্দ হয়েছে। রোজ সকাল বিকাল সে জানালার কাছে বসে। বসে বসে আকাশ দেখে।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।

বাহ! আকাশটা কী সুন্দর। অন্যরকম লাগছে। একেবারে অচেনা। কালো ধূসর কোনো রকম মেঘই নেই। ঝকঝকে নীল। দূর থেকে দেখতে গভীর সমুদ্রের মতো। সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে সাদা সাদা নৌকো, জাহাজ। পালতোলা। পালছাড়া। নানা রকমের। নানা

আকৃতির। তবে সবগুলোরই রঙ এক। দুধের মতো ধবধবে সাদা। তরতর করে এক দিক থেকে আরেক দিকে যাচ্ছে। রুহি জানালার কাছে থাকা বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে। বালিশে হেলান দিয়ে আরও গভীর মনোযোগ দিয়ে আকাশ দেখে। আকাশে সাদা তুলো মেঘ।

যেন নীল সাগরে আছড়ে পড়ছে শত শত ঢেউয়ের ফেনা। রুহির কাছে কখনো নরম তুলোর পাহাড়। কখনো তুলতুলে সাদা হাওয়াই মিঠাই মনে হয়।

ইস! হাওয়াই মিঠাই একটু ছুঁয়ে দেখা যেত। তুলার পাহাড়ের পিঠে চড়ে ভেসে বেড়ানো যেত! কতই না মজা হতো!

ভাবতে ভাবতে নরম বালিশে মাথা রাখে রুহি।

দূর আকাশে চোখ দুটো এদিক ওদিকে ছোটাছুটি করতে করতে হঠাৎ এক জায়গায় থামে। একটা ছোট্ট তুলোর পাহাড়। তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। গোলগাল চেহারা। পুরো শরীরে তুলোর পোশাকে ঢাকা। ধীরে ধীরে রুহির দিকে আসতে লাগল।

বলল, আমার নাম অধরা। নীল আকাশেই আমাদের বাড়ি। তোমার নাম কী গো?

আমার নাম রুহানাতুস সাফা। বাবা আদর করে রুহি ডাকেন।

তা এখানে তো এর আগে

দেখিনি তোমাকে।

হ্যাঁ, আমরা নতুন এসেছি। আচ্ছা তোমাদের দেশে সবাই কী কাজে এত ব্যস্ত?

তুমি ঠিকই বলেছ। আমাদের আজ উৎসবের দিন। উৎসবে অনেক মজা

হয়, আনন্দ হয়। তাই সবার ব্যস্ততা।

এত সাজগোজ। 

ইস! আমি যদি যেতে পারতাম

তোমাদের দেশে! 

তুমি আসতে চাও? 

রুহি একটুও দেরি না করে ঝটপট বলল, হ্যাঁ, আমার খুব ইচ্ছে তোমাদের দেশ দেখার।

একটু দাঁড়াও! বলেই অধরা ভেসে ভেসে রুহির কাছে আসতে লাগল।

আসতে আসতে বলল, তুমিও ছোট আমিও ছোট। আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অধরা জানালার কাছে আসে।

পঙ্খিরাজ ঘোড়ার মতো ডানা মেলে বলল, এই নাও জলদি আমার পিঠে চড়ে বসো। তোমাকে নিয়ে যাবো আমাদের দেশে।

খুশিতে রুহি ঝটপট অধরার পিঠে চড়ে বসল।

রুহিকে নিয়ে অধরা ভেসে চলল। মেঘের দেশে। সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলল গ্যাস বেলুনের মতো। অনেক দূর। অনেক ওপর দিয়ে। যতই ওপরের দিকে যাচ্ছে ততই নিচের সব ছোট হয়ে আসছে। রুহি নিচের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। এভাবে তো কখনো দেখা হয়নি। ওপর থেকে দেখতে তো খুব সুন্দর লাগে। ওই তো তাদের দালান। শত শত দালানকোঠায় ঠাসা শহর এলাকা পেছনে ফেলে আরও সামনে এগোতে থাকে। ছড়ানো মাঠ। সোনালি রঙের ফসলে ভরা। মনে হয় ধানক্ষেত। ক্ষেতের কিনারে বড় তালগাছ। গাছে পাকা তাল। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখে বিশাল মাঠ। ছেলেরা খেলা করছে। একটা ছোট্ট নদী। নদীর পাড়ে সাদা কাশফুল। বাতাসে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কী অপরূপ!

অধরা বলল, ভালো করে আমাকে ধরে বস। এখন আমরা আরও ওপরের ।

দিকে যাব।

ধীরে ধীরে ওরা ওপরের দিকে চলে গেল। সেখানে শত শত সাদা মেঘ। কোনটি অধরার মতো ছোট আবার কোনটি মাঝারি। আবার কোনটি বেশ বড়সড়। কিন্তু সবগুলোই সাদা নরম তুলতুলে।

দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা উড়োজাহাজ শোঁ শোঁ... শব্দে এগিয়ে আসতে লাগল। সাঁই করে মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়ল। কয়েকটা মেঘকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। নিজস্ব নিয়মে নিজেদের ঠিকঠাক করে নিল আহত মেঘগুলো।

রুহিকে নিয়ে অধরা আরও দূর যেতে লাগল। সাদা মেঘেরা দল বেঁধে কেউ সামনে যাচ্ছে আবার কেউ বা পেছনে। সবাই ছুটে চলছে। কারও সঙ্গে কারও কথা নেই। শব্দ নেই। চুপচাপ সাঁতার কেটে চলছে আপন মনে।

রুহি অধরাকে বলল, তোমাদের রাজ্যে সবাই এমন চুপচাপ কেন? কারও মুখে কোনো রা শব্দ নেই।

মুচকি হেসে অধরা বলল, ওহ! হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছো। আমাদের রাজ্যে এখন মনন পর্ব চলছে। এ সময় কেউ কথা বলে না। সবাই ধ্যানে মনোযোগী থাকে।

একটু পরেই মননপর্ব শেষ হবে। চলো আরও সামনে যাই। বলেই অধরা বাতাসের তালে তালে সাঁতরে এগিয়ে চলল।

যেতে যেতে রুহি দেখল সব সাদা মেঘের মাঝখানে একটা মেঘ একটু অন্যরকম। পুরো শরীর সাদা কিন্তু মুখের ডান পাশটা কালো।

অবাক হয়ে রুহি জানতে চাইল, তোমাদের রাজ্যে সবাই এক রকম। কিন্তু ও একটু আলাদা কেন? 

অধরা বলল, হ্যাঁ ও আমার বোন। কৃষ্ণমালা। জন্মের পর থেকেই ওর মুখে কালো দাগ। কালো বলে কিছু দুষ্ট মেঘ সবসময় ওর পেছনে লেগে থাকত। ওকে খুব অপমান করত। চলতে ফিরতে টিটকিরি করত। কিন্তু জানো, সেদিন দৌড় প্রতিযোগিতায় সে প্রথম হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিল। এখন সবাই তাকে সম্মান করে।

আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখা মেলে বিশাল এক মেঘের। দূর থেকে বরফ ঢাকা পাহাড়ের মতো লাগছে। 

অধরা বলল, উনি আমাদের রাজা মেঘদূত। সবাই তাকে বেশ সম্মান করে। তার কথা মেনে চলে।

বলতে না বলতেই চারদিকে কোলাহল শুরু হয়ে গেল। নীরবতা ভেঙে সবাই কথা বলা শুরু করল।

অধরা বলল, ওই তো মনন পর্ব শেষ হয়েছে। সবার প্রার্থনা শেষ। এসো তোমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। বলেই সামনে এগিয়ে অধরা রুহিকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

রাজা মেঘদূত রুহিকে স্বাগত জানিয়ে বলল, আমাদের রাজ্যে তুমি নতুন অতিথি। এই নাও তোমার জন্য সামান্য উপহার। বলেই মেঘদূত রুহিকে আদর করে একটা উপহার দেয়। উপহারটি দেখতে খুব সুন্দর। দেয়াল ঘড়ির মতো গোল। মুক্তা বসানো। মুক্তার ফাঁকে ফাঁকে নরম পালক গাঁথা। উপহারটি হাতে নিতেই পালকের নরম ছোঁয়া অনুভব করে। খুব খুশি হয় রুহি। মেঘের রাজ্যের সবাই তাকে খুব আদর করে। ছানার বাতাসা খেতে দেয়। 

অধরা বলল, চলো এবার তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

শুনে রুহি অপ্রস্তুত হয়ে যায়। মেঘের রাজ্য তার খুব ভালো লেগেছে। সে এখান থেকে যেতে চায় না।

রুহি বলল, না আমি যাব না। তোমাদের দেশে আরও থাকতে চাই।

অধরা বলল, তোমার বাবা-মা তোমাকে না পেলে খুব কষ্ট পাবেন। বাবা-মাকে কষ্ট দিতে নেই। শোনো শরতের পুরো দুই মাস আছি আমরা। যেকোনো সময় আবার আমাকে স্মরণ করলেই হাজির হয়ে যাব তোমার কাছে। আমার সঙ্গে আবার আসতে পারবে মেঘের দেশে। এবার চলো।

হাসিমুখে সবাই রুহিকে বিদায় জানালো। রুহিও সবাইকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে লাগল।...

রুহি সোনা! একা একা চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কার সঙ্গে কথা বলছ? জলদি ডায়নিংয়ে আসো। নাশতা ঠা-া হয়ে যাচ্ছে। স্কুলের সময় হয়ে গেল যে। সেই কখন থেকে ডাকছি!

মায়ের ডাকে চেতনা ফিরে পায় রুহি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত