বিশ্বব্যাপী বাঁশ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

বিশ্বে বাঁশবনের মোট আয়তন প্রায় ৩৬ মিলিয়ন হেক্টর, যা মূলত এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, আমেরিকা এবং আফ্রিকার বাঁশ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে বিস্তৃত। তবে পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাঁশবনের বৃহত্তম এলাকা রয়েছে এবং বিশে^র প্রায় ৮০ শতাংশ বাঁশের প্রজাতি এখানেই পাওয়া যায়।

সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীতে (নাতিশীতোষ্ণ, গ্রীষ্মম-লীয় এবং বিরুৎ-জাতীয়) ১৩৯টি গণের অধীনে ১৮২১টি স্বীকৃত বাঁশের প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে চীনে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭০০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় অবস্থানে প্রতিবেশী দেশ ভারত। চীনের সভ্যতায় বাঁশকে শুভশক্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এ কারণে চীনা সংস্কৃতির সর্বত্র রয়েছে বাঁশের ব্যবহার। তারা মনে করে বাঁশ নেগেটিভ এনার্জিকে প্রতিহত করতে পারে।

চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ বাঁশের ব্যবহার শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বাঁশের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে অসাধারণ সব হস্তশিল্প ও স্থাপত্য নির্মাণশৈলী তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের বিজ্ঞানীরা বাঁশের সেলুলোজ  থেকে প্রেট্রোলিয়াম প্লাস্টিক উদ্ভাবন করেছেন, যেটি মাত্র ৫০ দিন মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাংশে, মোটামুটি ২০ক্ক৭৫´ উত্তর এবং ২৫ক্ক৭৫´ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ দেশে সাধারণত ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু বিরাজ করে। বাংলাদেশ মূলত একটি সমতল ভূমির দেশ। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়া দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের উঁচু ভূমি বা টিলা-অঞ্চল বাদে বাকি অংশ নিচু, সমতল ও উর্বর ভূমিতে গঠিত। ফলে এখানকার মাটি ও জলবায়ু বাঁশের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। সারা দেশে বাঁশের প্রায় ৯টি গণ ও ৩৩টি প্রজাতি জন্মে থাকে। গত ১৫ বছরে দেশে মোট বাঁশবাগানের ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে,

প্রকৃতির পুনরুদ্ধার সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উজাড়ের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বাঁশবাগান। একসময় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা বাঁশবাগান এখন দ্রুত কমে আসছে। এ অবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পরিবেশবাদী ও বন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১৫ বছরে দেশে মোট বাঁশবাগানের ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির পুনরুদ্ধার সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উজাড়ের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বাঁশবাগান। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতি সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের বন উজাড়ের ফলে দেশের বাঁশসম্পদ ধীরে ধীরে কমছিল। তবে প্রকৃত মোড় পরিবর্তন ঘটে ২০১৭ সালে, যখন মিয়ানমারে ব্যাপক সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন গড়ে তোলা হয় মূলত বাঁশের তৈরি ঘরের মাধ্যমে। ফলে সে সময় দেশে বাঁশের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এরপর থেকে প্রতি বছর অন্তত দুই কোটি বাঁশের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাবে দেশের বাঁশবাগানের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

বাংলাদেশের মাটি, মৌসুমি জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান বাঁশের জন্য আদর্শ স্থান। তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও নির্বিচারে বাঁশ উজাড় করায় প্রকৃতির এ মূল্যবান সম্পদ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। পৃথিবীর ৮০ ভাগ বাঁশই এশিয়া মহাদেশে জন্মে। তবে বর্তমানে ইউরোপ ও আফ্রিকাও বাঁশের পেছনে ছুটছে। কারণ বাঁশ জন্মানো সহজসাধ্য, অন্যান্য বনজ সম্পদের চেয়ে লাভজনক ও এর বহুবিধ ব্যবহার। মাটির ওপর দ-ায়মান এ খাড়া উদ্ভিদ সামান্যতম জায়গা দখল করে অনেকগুণ অর্থকরী ফসল প্রদান করে। একই সঙ্গে পতিত জমি আবাদযোগ্য করে তোলে, ভূমির ক্ষয়রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণের উপাদান হিসেবে সহজেই সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলে। বাঁশ অন্য যেকোনো উদ্ভিদের চেয়ে বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে ও বেশি পরিমাণ কার্বন শোষণ করে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সরকারের যে ২৫ কোটি গাছ লাগানো প্রকল্প, এর মধ্যে অন্যান্য গাছের পাশাপাশি অন্তত কয়েক কোটি বাঁশ রোপণ প্রয়োজন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত