সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এপিএস) কাজী নিশাত রসুলের বোন কাজী তুহিন রসুল বাড়ি ভাড়ার নামে সরকারের প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। জার্মানির বাংলাদেশ দূতাবাসে কনস্যুলার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এটা করেছেন। রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ৩৪টি কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টের ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে সাধারণ পাসপোর্টে পরিণত করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ও দুই বোনের নামে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল প্রকল্পে ৫ কাঠা করে মোট ১৫ কাঠার প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে।
অভিযোগে জানা গেছে, কাজী তুহিন রসুল তার বাবার পরিচয় ব্যবহার করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে পদস্ত আমলাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত ছিল তার অবাধ যোগাযোগ। আর এ জন্যই তাকে গুরুতর সব অনিয়মের পরও কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পায় দুদক। কমিশন অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে। দুদকের অনুসন্ধান দল অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কাজী তুহিন রসুল ও তার দুই বোন কাজী নিশাত রসুল এবং কাজী নাহিদ রসুলের তথ্য সংগ্রহ করেছে। শিগগিরই অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, কাজী তুহিন রসুল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার প্রথম রায়দানকারী বিচারক কাজী গোলাম রসুলের মেয়ে। তিনি এই পরিচয়কে পুঁজি করে বার্লিনের বাংলাদেশ মিশনে ১০ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট বার্লিনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার লেখা একটি গোপন চিঠি এবং ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দূতাবাসের কনস্যুলার বিষয়ক টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে কাউন্সেলর কাজী তুহিন রসুলের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি বেরিয়ে আসে।
বাড়ি ভাড়ার নামে কোটি টাকা লোপাট : অভিযোগে বলা হয়, কাজী তুহিন রসুল বার্লিনে যে বাসায় থাকতেন, তার মাসিক ভাড়া দেখানো হয় ৩ হাজার ৪০০ ইউরো। প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্ট এসওকেএ-বিএইউ (ঝঙকঅ ইঅট) কর্র্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানায়, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে বাসা ভাড়ার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯৫ ইউরো ও সিকিউরিটি ডিপোজিট ছিল ৪ হাজার ১৭০ ইউরো। কিš‘ কাজী তুহিন রসুল ভুয়া এবং জাল চুক্তিপত্রের মাধ্যমে ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বাসা ভাড়া বাবদ ৩ হাজার ৪০০ ইউরো এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট বাবদ ৮ হাজার ৯৮৫ ইউরো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করেন। সরকারি বিধান অনুযায়ী এটা গুরুতর অপরাধ। কাজী তুহিন রসুল প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১ হাজার ৬০৫ ইউরো করে ৪৬ মাসে শুধু বাড়ি ভাড়া বাবদ প্রায় ৭৪ হাজার ইউরো বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় কোটি টাকা। তিনি এই জালিয়াতির পাশাপাশি বেআইনিভাবে এসওকেএ-বিএইউ কোম্পানির সিল, লোগো ব্যবহার এবং জাল চুক্তিপত্র তৈরি করেন। বিষয়টি জানাজানির পর বাসা ভাড়ার চুক্তিটি বাতিল করা হয়।
৩৪ কূটনৈতিক পাসপোর্ট সাধারণে বদল : কাজী তুহিন রসুলের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে। টাস্কফোর্স সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বার্লিন মিশনের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের ৩৪টি কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টের ক্যাটাগরি সাধারণ পাসপোর্টে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, পাসপোর্টের ক্যাটাগরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূত তথা মিশন প্রধান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অভিযোগটি বাড়িভাড়ার চেয়ে আরও স্পর্শকাতর। কারণ কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্ট রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে ৩৪টি পাসপোর্টের ক্ষেত্রে কার আবেদন, কী কারণে পরিবর্তন, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে কার স্বাক্ষর রয়েছে তা জানা জরুরি। এ ছাড়া তার দায়িত্বকালে শুধু ৩৪টি পাসপোর্ট পরিবর্তন নয়, বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালুর সময় কাজী তুহিন রসুল কনস্যুলার দায়িত্বে ছিলেন। ই-পাসপোর্ট ও এমআরভি ভিসা পদ্ধতি পরিচালনা নিয়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
বার্লিনের অভিযোগের পরও গুরুত্বপূর্ণ পদে : কাজী তুহিন রসুলের এই দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট জারি করা এক আদেশে তাকে বার্লিনে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে ঢাকায় প্রত্যাহার করা হয়। তবে ঢাকায় ফেরার পর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে বঙ্গভবনের পারসোনাল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি তাকে জার্মানি সফরের জন্য এক মাসের ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
পূর্বাচলে তিন বোনের ১৫ কাঠা : কাজী তুহিন রসুলের বিরুদ্ধে গুরুতর আরেক অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে রাজউকের প্লট হাতিয়ে নেওয়া। রাজউকের তালিকা অনুযায়ী কাজী তুহিন রসুল, কাজী নিশাত রসুল ও কাজী নাহিদ রসুল তিন বোনই পাঁচ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজী নিশাত রসুল ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এপিএস), কাজী নাহিদ রসুল মুন্সীগঞ্জ ও গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ছিলেন এবং কাজী তুহিন রসুল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনজনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার রায় প্রদানকারী বিচারক কাজী গোলাম রসুলের মেয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিও ওই কোটায় প্লট পেয়েছেন। তাহলে কাজী তুহিন রসুল ও তার দুই বোনের ক্ষেত্রে ‘অসামান্য অবদান’ হিসেবে কী বিবেচনা করা হয়েছিল এটাই এখন বড় প্রশ্ন। তাদের তিনজনের আবেদন, সুপারিশ, যোগ্যতা, বরাদ্দ কমিটির কার্যবিবরণী এবং রাজউকের অনুমোদনের নথি পর্যালোচনা করে বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার হতে চায় দুদক।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল সোমবার বঙ্গভবনে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার একজন কর্মকর্তা বলেন চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি মাসে পটুয়াখালী জেলা পরিষদে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু পটুয়াখালী জেলা পরিষদে এই নামে কোনো কর্মকর্তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তুহিন রসুল সম্ভবত দেশ ছেড়ে তার স্বামীর কাছে জার্মানি চলে গেছেন বলে বঙ্গভবনের ওই কর্মকর্তা জানান।
দুদক কর্মকর্তা যা জানালেন : দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, কাজী তুহিন রসুল জার্মানির বার্লিনে দায়িত্ব কনস্যুলার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভাড়ার নামে সরকারি টাকা লোপাটের ঘটনাটি বিদেশি একটি সংস্থার অডিটে উঠে এলে তিনি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। তুহিনের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ৩৪টি কূটনৈতিক পাসপোর্টের ক্যাটাগরি পরিবর্তনের যে অভিযোগ, তা তার একার পক্ষে করা সম্ভব নয় বলে ধরে নেওয়া যায়। পাসপোর্ট ইস্যুর অনুমোদন মূলত হয়ে থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা, কী সুপারিশের ভিত্তিতে পাসপোর্টের ক্যাটাগরি পরিবর্তন করেছেন, তার অনুসন্ধান চলমান।
তিনি আরও জানান, তুহিনের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে রাজউক থেকে নিজের ও দুই বোনের নামে ৫ কাঠা করে মোট ১৫ কাঠা প্লট নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। এসব প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তারও অনুসন্ধান চলমান। দুদকের অনুসন্ধান টিম তাদের অনুসন্ধান সম্পন্ন করে কমিশনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।