স্থানীয় সরকার নির্বাচন

ইসি ও সরকারের বড় পরীক্ষা

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ এএম

আমরা জানি, স্থানীয় সরকার হলো জনপ্রশাসনের বা সরকারের এমন একটি রূপ, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি প্রদত্ত রাষ্ট্রের মধ্যে প্রশাসনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করে। স্থানীয় সরকার সাধারণভাবে আইনের দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতায় বা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে। স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ হলো সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাঠামো। জনপ্রশাসন ও সুশাসন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক স্বার্থের অভিঘাতে তাতে ক্ষয়ের স্পর্শ লেগেছে নানাভাবে। তবে আশার কথা, বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকারের ঔজ্জ্বল্য ফেরাতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ১৫ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন ৭ ধাপে সম্পন্ন হবে। সময়ও লাগবে ৭ মাস। প্রথম ধাপের নির্বাচন হবে ১২ নভেম্বর।

১৫ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসির ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সার্বিক প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছে ইসি, এও বলা হয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে। অনেক আলাপ-আলোচনার পর ইউনিয়ন পরিষদ  নির্বাচন দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকারের ভোট পর্ব। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউপি ভোট এবং এরপর শুরু হতে পারে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। নির্বাচন শুরুর আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক, আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা নিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত বৈঠক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে ইসি, এই বার্তা মিলেছে ইসির বিভিন্ন সূত্রে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বিগত কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা ব্যাপক ক্ষত সৃষ্টি করে। শুধু রক্তারক্তিই নয়, ভোটপর্বের অস্বচ্ছতাও বহুবিধ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। আইন সংশোধনের ফলে এবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না।

ইউপি নির্বাচন নিয়ে অংশীজনের সঙ্গে সংলাপে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। আমরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে এ কথাও বলতে চাই, নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত করাসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যেন প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার মুখে না পড়েন তা নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের। নির্বাচনের ব্যাপারে যদিও ইসিই নিয়ামক শক্তি, কিন্তু সরকার ও প্রশাসনকে এ ক্ষেত্রে নির্মোহ সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে আইনের যথাযথ অনুসরণে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়দায়িত্ব রয়েছে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখার। কারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের সিংহভাগই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ, থাকছে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের সুযোগ। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের সংস্কৃতি অনুযায়ী, নির্বাচন সামনে এলেই শহর ও গ্রামের দৃশ্যপট বদলে যায়। এবার স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইউপি নির্বাচন দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, ইসি ও সরকারের সামনে এই প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ আরও বেশি।

নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নির্বাচনী আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ করা হলেও, এর ব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে এখনো কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। এআই দিয়ে একজন প্রার্থীর কণ্ঠস্বর নকল করে বক্তব্য তৈরি, পুরনো বক্তব্যকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা খুব সহজেই ছড়ানো যায়। অযোগ্যরা যাতে নির্বাচিত হতে পারেন এর জন্য ভোটারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থার ওপরও আমরা বিশেষ গুরুত্বারোপ করি। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার না করা, ভোটারকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা রুখে দেওয়া, নির্বাচনী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক আচরণের নানা দিকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষকে দৃষ্টি গভীর করতে হবে এখন থেকেই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, নির্বাচন কেবল শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়। আরও মনে রাখা জরুরি, জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দলীয় সরকারের অধীনে। তারা যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত