পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র ও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিদ্যালয় ও হাসপাতালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে নতুন যে যুদ্ধের সূচনা ঘটায়, গত ২৮ আগস্ট তার ৬ মাস পূর্ণ হলো। যুদ্ধ আপাতত কিছুটা স্তিমিত হয়ে আছে প্রধানত দুটি কারণে : এক. যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার কাক্সিক্ষত ফলাফল লাভে ব্যর্থ হয়েছে এবং দুই. আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ যুদ্ধ ব্যাপকভাবে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনি পরিস্থিতিতে এ যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ ও কর্মকৌশল কী হবে, তা বোধকরি যুদ্ধনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও জানেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্র তা না জানলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিনপন্থি দেশগুলো ইতিমধ্যে বুঝে গেছে, সামনের দিনগুলো তাদের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক হবে না। আর সে উদ্বেগেরই প্রতিফলন হচ্ছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠন, যেটিতে বাংলাদেশও যুক্ত হতে চায়।
এই যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবিত দেশগুলোর (পাকিস্তান ও তুরস্ক বহুলাংশে মধ্যপ্রাচ্যেরই অংশ) সামরিক কৌশলগত অবস্থান, তখন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা গত ১০ সেপ্টেম্বর লোহিত সাগর তীরবর্তী বন্দরনগরী মোখা এবং ১১ সেপ্টেম্বর বাব আল-মানদেব জলপথে অবস্থিত পেরিম দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। হুতিদের এ অগ্রাভিযানের ফলে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়েছে সৌদি আরব, এমনকি ইয়েমেনের পশ্চিমা সমর্থক সরকারের চেয়েও বেশি মাত্রায়। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরবও মোখা বন্দরে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হুতিরা হয়তো সহসাই ইয়েমেনের আরও বৃহত্তর অঞ্চল নিজেদের দখলে নিতে চাইবে এবং সে ক্ষেত্রে এডেন বন্দরও যদি তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উল্লেখ্য, এডেন শুধু ইয়েমেনেরই সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর নয়, বিশ্বনৌপথেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, যেটির ওপর এশিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের নৌচলাচল ব্যবস্থাও বহুলাংশে নির্ভরশীল। ফলে হুতিদের এডেনমুখী যাত্রা কেবল সৌদি আরব ও তদসন্নিহিত দেশগুলোর জন্যই উদ্বেগের কারণ হবে না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল অন্য দেশগুলোকে যথেষ্টই ভোগাবে।
হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে। ফলে হুতিদের ওই অভিযানের ফলে হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মানদেব জলপথ ও সুয়েজ খালের ওপরও ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এখানেই রয়েছে হুতিদের ক্রমবর্ধমান সাফল্যকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিনপন্থি দেশগুলোর এতদিনকার হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি পাল্টে যাওয়ার অনিবার্য্যতা। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে ইয়েমেন, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার এবং এ অঞ্চলজুড়েই রয়েছে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ পাইপলাইনের একটি বড় অংশ। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব যখন হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন তাদের উত্তরাঞ্চলীয় তেল পাইপলাইনগুলো ব্যবহার করতে পারছিল না, তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা ইয়েমেন-সংলগ্ন দক্ষিণ সীমান্তের পাইপলাইনগুলোর দিকে অধিক হারে ঝুঁকছিল। কিন্তু হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি দূরত্বের মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপ দখলে নেওয়ার ফলে তাদের সে অঞ্চলের তেল সরবরাহ কার্যক্রমও এখন নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে পড়ল।
সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশীরা হয়তো একটু বেশিই ভয় পেয়ে গিয়ে থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমী মিত্রদের বছরের পর বছর ধরে উদার হস্তে তেলসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান এবং সেই সঙ্গে নিরন্তর আনুগত্য জোগানো সত্ত্বেও শেখ-বাদশাহদের সঙ্গে তাদের প্রভুসুলভ আচরণ কিছুতেই থামছে না। তদুপরি চরম বিপদের সময়ও প্রভুরা আর আগের মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। এমনি পরিস্থিতিতে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর ও পেরিন দ্বীপ দখল করে নিয়ে যেভাবে মূল ভূখণ্ডের দিকে এগোচ্ছে, তাতে করে সৌদি আরব হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও এক দফা সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানাবে, যেখানে ইউএই, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান প্রভৃতি দেশেরও সমর্থন থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি তাতে সাড়া দেবে? মনে তো হয় না। আর দিলেও তা দেবে নতুন কোনো সুবিধা ও অমর্যাদাকর আনুগত্যের বিনিময়ে। তবে সেটিও তাদের আগের অবস্থায় টিকে থাকতে কতটা যথেষ্ট হবে, তাও নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
এমনি পরিস্থিতিতে জনগণের সঙ্গে সংশ্রববিহীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা নিয়ে এগোতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলো এতকাল তাদের যে ধরনের নিরাপত্তা দিয়ে আসছিল, তা ছিল একান্তই কৌশলগত স্বার্থ, বাণিজ্যক সুবিধা ও একচেটিয়া মুনাফার বিনিময়ে। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে এরা সবাই অচেনা হয়ে দূরে সরে যাবে এবং মক্কা চুক্তি করেও আর নিজেদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। ফলে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে যত দ্রুত সম্ভব অগণতান্ত্রিক রাজব্যবস্থা থেকে সরে এসে জনগণের শাসনব্যবস্থার পথে এগোতে হবে এবং সেটাই হতে পারে নিরাপত্তার সর্বোত্তম রক্ষাকবচ। এতদিন হয়তো বিষয়টি তাদের বোধ, চেতনা ও উপলব্ধিকে স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা তা হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন বলেই আশা রাখি। মোখা ও পেরিমে হুতিদের এ অগ্রাভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আজ যে মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে, পশ্চিমী ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান দিয়ে তা মোকাবিলা না করে সংশ্লিষ্ট বাদশাহ ও আমিরেরা সেটিকে জনগণের শাসন দিয়ে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করবেন, এটিই প্রত্যাশা।
লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক ও বিশ্লেষক।