পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ১৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার ওপরে অদৃশ্য একটি পাতলা গ্যাসীয় স্তর রয়েছে, যেটি পৃথিবীতে থাকা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণের জীবন রক্ষা করে চলেছে; সেটির নাম হলো ওজোনস্তর। এটি সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক জীবজগতকে রক্ষা করে থাকে। এই সুরক্ষাকারী ওজোনস্তর এক সময় মানুষের তৈরি রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছিল। পরে অবশ্য মানবজাতির সম্মিলিত উদ্যোগে সেই বিপর্যয় ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যা পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে বিরল সাফল্য হিসেবে মনে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে ওজোনস্তর ১৯৮০ সালের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন শিল্প রাসায়নিকের ব্যবহার ওজোনস্তরের ভবিষ্যৎকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন। এদিকে ওজোনস্তর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ওজোন দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘শীতলতর পৃথিবীর জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ’। মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের সাফল্য এবং কিগালি সংশোধনীর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার গুরুত্ব তুলে ধরতে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওজোন হলো অক্সিজেনের একটি বিশেষ রূপ, যার প্রতিটি অণুতে তিনটি অক্সিজেন পরমাণু থাকে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে (বায়ুম-লের দ্বিতীয় স্তর) ওজোনের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই অঞ্চলকে বলা হয় ওজোনস্তর। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা অতিবেগুনি রশ্মির একটি বড় অংশ ওজোনস্তর শোষণ করে। বিশেষ করে ইউভি-বি ও ইউভি-সি রশ্মি জীবজগতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে ক্যানসার, চোখের ছানি পড়া ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। উদ্ভিদের কোষীয় কার্যক্রম ও সামুদ্রিক জীবের প্রজননেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ ওজোনস্তর পৃথিবীর জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন। আকাশের ওপরে অদৃশ্যমান এই একটি পাতলা গ্যাসীয় স্তর পৃথিবীর কোটি কোটি প্রাণের জীবন রক্ষা করে। এটি বৈশ্বিক পরিবেশ সুরক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ওজোনস্তর ধ্বংস হয়ে গেলে মানবসভ্যতা ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়বে। কারণ সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছালে ত্বকের ক্যানসার ও চোখের রোগ বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।
জানা গেছে, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক বায়ুমণ্ডলে গিয়ে ওজোন অণু ধ্বংস করছে। বিশেষ করে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি, হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ও মিথাইল ব্রোমাইড ছিল অন্যতম ক্ষতিকর রাসায়নিক। এসব পদার্থ একসময় ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, অ্যারোসল স্প্রে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো; যা বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পৌঁছে এসব রাসায়নিক থেকে ক্লোরিন ও ব্রোমিন পরমাণু বের হয়ে ওজোন অণু ভেঙে দিতে শুরু করেছে। এর ফলে অ্যান্টার্কটিকার ওপর তৈরি হয় বিশাল ওজোন হোল। ১৯৮৫ সালে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার ওপর ভয়াবহ ওজোনস্তর ক্ষয়ের তথ্য প্রকাশ করেন। এটি বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জানান, ওজোনস্তর রক্ষায় ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় মন্ট্রিয়ল প্রটোকল। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ওজোনস্তর ধ্বংসকারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় দেশগুলো। জাতিসংঘের নেতৃত্বে পরিচালিত এই চুক্তিকে বিশ্বের সবচেয়ে সফল পরিবেশ চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মন্ট্রিয়ল প্রোটোকলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত প্রায় ৯৯ শতাংশ ওজোনস্তর ধ্বংসকারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজোনস্তর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফল এটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে। গত চার দশকের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা সেই ভয়াবহ ভবিষ্যৎকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ শুধু ওজোনস্তর রক্ষাই করেনি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে আশার খবরও পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের অ্যান্টার্কটিক ওজোন গর্ত গত কয়েক দশকের তুলনায় তুলনামূলক ছোট ছিল। ১৯৭৯ সালের পর থেকে ৪৬ বছরের স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে ২০২৫ সালের ওজোন গর্ত ১৪তম ক্ষুদ্রতম হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান নীতিমালা কার্যকর থাকলে অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে ওজোনস্তর ১৯৮০ সালের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে ২০৬৬ সালের দিকে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, পুনরুদ্ধারের প্রবণতা আশাব্যঞ্জক হলেও ওজোনস্তর এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। বায়ুমণ্ডলে নির্গত কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক দীর্ঘদিন পর্যন্ত থেকে যায়। ফলে বর্তমানে নিষিদ্ধ পদার্থের প্রভাবও বহু দশক ধরে চলতে পারে। এ ছাড়া নতুন ধরনের শিল্প রাসায়নিক, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ ওজোনস্তরের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। তাই ওজোনস্তরের ক্ষয়রোধের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এ বিষয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওজোনস্তরের ক্ষয় রোধে চারটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেটের ব্যবহার, দেশীয় এসি ও ফ্রিজ প্রস্তুতকারক কারখানাগুলোতে ক্ষতিকর এইচসিএফসি এবং এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বা জিরো-ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাস (যেমন আর-৬০০এ) ব্যবহার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ফ্রিজ ও এসি মেরামতের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় টেকনিশিয়ানদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা, যাতে সার্ভিসিংয়ের সময় গ্যাস বাতাসে মিশে না যায় এবং পুরনো গ্যাস রিকভারি বা রিসাইকেল করা সম্ভব হয়। তৃতীয়ত, দেশের সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোয় গ্যাস ডিটেক্টর স্থাপন এবং কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ওজোন ক্ষয়কারী কেমিক্যালের অবৈধ প্রবেশ বা চোরাচালান বন্ধ করা। আর সর্বশেষ হচ্ছেনগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এসির চাহিদা কমাতে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ (গ্রিন বিল্ডিং) এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী উন্নত কুলিং টেকনোলজির প্রচার ও প্রসার ঘটানো।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের মানুষ সারা বছরই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। ওজোনস্তরের ক্ষয় সরাসরি বাংলাদেশের ওপর অ্যান্টার্কটিকার মতো প্রভাব না ফেললেও অতিবেগুনি রশ্মির মাত্রা বৃদ্ধি হলে জনস্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। অতিবেগুনি রশ্মির অতিরিক্ত সংস্পর্শে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যও পরিবেশগত পরিবর্তনে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
ওজোনস্তর রক্ষায় বিশ্বের দেশগুলো রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একটি যৌথ সমাধানের পথে এগিয়ে যায় এবং তার ফলও পেয়েছে। প্রায় চার দশক পর এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর সুরক্ষাকবচ ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও দূষণের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এই অভিজ্ঞতা নতুন আশার জন্ম দেয়। ওজোনস্তর পৃথিবীর কোটি কোটি প্রাণের জীবন রক্ষা করে চলেছে। মানুষের ভুলে সেই স্তর বিপন্ন হয়েছিল, আবার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই তা পুনরুদ্ধারের পথে ফিরছে। ওজোনস্তরের পুনরুদ্ধার তাই শুধু পরিবেশবিজ্ঞানের সাফল্য নয় এটি প্রমাণ করে, বিশ্ব চাইলে বৈশ্বিক সংকটের সমাধান সম্ভব।
বিশ্ব ওজোন দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ১০ বছর আগে মন্ট্রিয়ল প্রোটোকলের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে হাইড্রোফ্লুরোকার্বন এইচএফসির মতো শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাসের ব্যবহার কমাতে কিগালি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম তাপপ্রবাহের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কার্যকর শীতলীকরণব্যবস্থায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জীবন রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কিগালি সংশোধনী পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সর্বোচ্চ ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বিত বাস্তবায়ন করা হলে এই সুফল আরও বাড়তে পারে। বিশ্ব ওজোন দিবসে সব দেশকে কিগালি সংশোধনী অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি টেকসই শীতলীকরণব্যবস্থায় রূপান্তর ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।