মাতৃ ও শিশুমৃত্যুহার কমাতে হচ্ছে ৩৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০০ জনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৯৩০ জনের। মৃতদের অধিকাংশই শিশু। এরই মধ্যে সরকার দেশের মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিধি বাড়িয়ে মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে ৩৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ শনাক্তকরণ, রোগীদের ফলোআপ এবং জটিল রোগীদের উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হবে। একই সঙ্গে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে সেবার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ‘হেলথ সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং থ্রো এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডিস কন্ট্রোল’ প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট। প্রকল্পটি আজ (বুধবার) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৭৫ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ৩২১ কোটি ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটির লক্ষ্য মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ও মৃত্যুহার কমানোর পাশাপাশি মাতৃ, নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে

প্রয়োজনীয় সেবার মান ও পরিধি বাড়ানো হবে। প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে প্রতিটি মা, নবজাতক ও শিশুর জন্য মানসম্পন্ন এমএনসিএইচ (মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য) সেবার আওতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে এসব সেবা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পটিতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৭০ জনের নিচে, নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১২ এবং শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৩০টি জেলা হাসপাতাল, ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১৪ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও ফলোআপ করা হবে। এর সঙ্গে অসংক্রামক রোগের ওষুধ বিতরণ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রমও থাকবে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, মাতৃ ও শিশুসহ স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র, কম শিক্ষিত নারী ও নবজাতকরা এখনো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক এলাকা এবং মানবিক সংকটপূর্ণ অঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবার ফলাফল তুলনামূলকভাবে কম। এ ছাড়া দেশে অসংক্রামক রোগ বর্তমানে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব রোগ দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে হৃদ্রোগ সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং দেশের মোট মৃত্যুর ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী। ২০২২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে বয়স-সমন্বিত ডায়াবেটিসের প্রবণতা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অসংক্রামক রোগ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, তামাকের ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত পারিবারিক ব্যয় বাড়ছে। এতে দরিদ্র ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে করেন তারা।

প্রকল্পটি দেশের আট বিভাগ ও ৬৪টি জেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় রয়েছে ৩০টি জেলা হাসপাতাল, ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১৪ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি জেলার একটি করে জেলা হাসপাতাল, প্রাথমিক পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি পর্যায়ে দেশের সব সক্রিয় কমিউনিটি ক্লিনিককে প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার ওয়ার্ড পর্যায়ে অবস্থিত সব কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। তবে পৌরসভা এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এর আওতার বাইরে থাকবে।

এ প্রকল্পের বিষয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সাবেক সভাপতি ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শিশু মৃত্যুহার বর্তমানে প্রায় ৩২-এর মতো, যা ২৫-এ নামিয়ে আনা সম্ভব। তবে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ১৫৫-এর মতো। সেটিকে ৭০-এ নামিয়ে আনা মানে অর্ধেকেরও কমে নিয়ে আসা, যা কঠিন হবে। আর নবজাতকের মৃত্যুহার ১২-তে নামিয়ে নিয়ে আসাও সহজ নয়, কারণ এটি মাতৃমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। গর্ভকালে মা মারা গেলে নবজাতকেরও মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। তাই মাতৃমৃত্যু অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো সহজ হবে না।

তিনি আরও বলেন, এসডিজি-৩-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে মাতৃ, শিশু ও নবজাতকের মৃত্যুহার রয়েছে। এগুলো জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই জাতির উন্নয়নের জন্য শিশু, মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো প্রয়োজন। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ধরনের প্রকল্প সবসময়ই থাকা উচিত। তবে সমস্যা হলো, যেসব ক্ষেত্রে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন, সেগুলোতে নির্দিষ্টভাবে গুরুত্ব না দিয়ে অনেক সময় গড়পড়তা একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়।

ড. জাকির হোসেন বলেন, এর আগে সরকারি ক্লিনিকগুলোয় সেবা বাড়ানোর জন্য অনেক প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প কার্যকর করতে হলে যেসব সমস্যা বেশি, সেগুলোর সমাধানে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং কার্যক্রমের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। যে কারণে শিশু, মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে, সেই কারণগুলোর ভিত্তিতে কর্মসূচি থাকতে হবে। গড়পড়তা কোনো প্রকল্প করলে হবে না। এসব নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিতে হবে এবং বাজেটও সেসব খাতে বেশি দিতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত