গুদামে জায়গা নেই, আরও চাল কিনছে সরকার

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২১ এএম

বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার বেশি ধান ও চাল সংগ্রহ করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। ফলে সরকারের কাছে এই মুহূর্তে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ তৈরি হয়েছে। এ মজুদ গুদামের কার্যকরী সক্ষমতার তুলনায় বেশি হওয়ায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আরও দুই লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত এই বরাদ্দের কারণে স্থানীয় বাজারে চালের দামে বিরূপ প্রভাব তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিলারদের কাছ থেকে চাল নেওয়ার জন্য সারা দেশ থেকে ডিও লেটার দিয়েছেন বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যরা। এতে চাপ তৈরি হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় মিলমালিকদের পুনঃবরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রায় দুইশ সংসদ সদস্যের দেওয়া ডিও লেটারের বিপরীতে খাদ্য অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত সাড়ে ৮শ মিলমালিককে চালের অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। ইতিমধ্যে এর পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার টন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশি^ক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরকার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যই অতিরিক্ত মজুদ তৈরির পথে হাঁটছে, যাতে করে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায়।

জানা গেছে. ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে সরকার ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল। এর মধ্যে ৫ লাখ টন ধান এবং সিদ্ধ ও আতপ মিলিয়ে বাকিটা চাল। গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান, ১২ লাখ ১২ হাজার টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ ৫ হাজার ৮৭৯ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহ করেছে সরকার।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান ও চাল কেনায় সরকারের রেকর্ড পরিমাণ মজুদ তৈরি হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামের কার্যকরী সক্ষমতা ২২ লাখ ৯৫ হাজার টন হলেও সরকারের কাছে এখন খাদ্যশস্যের মোট মজুদ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৭ টন।

খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারে বোরো উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং খাদ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রার বেশি কিনেছে। এ ছাড়া বৈশি^ক যুদ্ধ পরিস্থিতির এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি দুই লাখ টন চাল সংগ্রহের অনুমোদন রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা এখন কেনা হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টনের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

জানা গেছে, চুক্তিবদ্ধ ৮ হাজার ৮১৭টি মিলের কাছ থেকে বোরো মৌসুমের মূল বরাদ্দের চাল কেনে খাদ্য অধিদপ্তর। এবারে প্রতি কেজি চাল ৪৯ টাকায় কেনা হয়। ধানের দাম স্থিতিশীল থাকায় মিলারদের নতুন চালেই কেজিতে প্রায় ৭ টাকা লাভ হয়। বেশি লাভের সুযোগ থাকায় কোনো কোনো মিলমালিক নিজের বরাদ্দের চাল খাদ্য অধিদপ্তরকে দেওয়ার পর পুনঃবরাদ্দের তদবির শুরু করেন। কয়েকটি জেলার অল্প কিছু মিলমালিক সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের ডিও লেটার নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৮টি মিলমালিককে পুনঃবরাদ্দ দেওয়ার জন্য গত ২৪ জুন চিঠি দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এসব মিলমালিক আগে যে পরিমাণ চালের বরাদ্দ পেয়েছিলেন তার ২৫ শতাংশ পুনঃবরাদ্দ দেওয়া হয়। এ খবর জানাজানি হওয়ার পর সারা দেশ থেকেই মিলমালিকরা পুনঃবরাদ্দের আবেদন করতে শুরু করেন। সবাই আবেদন করেন নিজ জেলার সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার নিয়ে। এতে আবেদন ছাড়িয়ে যায় ৮৫০টি। অনেক মালিক মিলের সক্ষমতার কয়েকগুণ বাড়তি বরাদ্দ চেয়েও আবেদন করেন। ফলে চাপে পড়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

খাদ্য অধিদপ্তর সবার ক্ষেত্রে আগের বরাদ্দের ২৫ শতাংশ কোটা মানতে পারেনি বলে জানা গেছে। যারা বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন, তারা বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন। যেমন এক মিলমালিক আগে সাড়ে ৭শ টন চাল দিয়েছেন। তিনি পুনঃবরাদ্দ পেয়েছেন ৫শ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে জায়গা নেই। বাড়তি চাল কিনে রাখার মতো স্থানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে নষ্ট হওয়ারও অতিমাত্রায় ঝুঁকি রয়েছে। এভাবে পুনঃবরাদ্দের কারণে বাজারে চালের দামে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। শঙ্কা রয়েছে মৌসুম শেষ হওয়ার দোহাই দিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন মিলমালিকরা। মন্ত্রণালয় বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে ভোক্তার ওপর যেমন চাপ তৈরি হতে পারে, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ও ঘটতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত