রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘অনেক ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটিয়ে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি। তাই গণতন্ত্র রক্ষা করাই এখন প্রধান কাজ। আমাদের আগামীর লড়াই দেশ পুনর্গঠন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। আগামী প্রজন্মকে একটি সমৃদ্ধ দেশ উপহার দেওয়া।’ রাষ্ট্রপতি গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে তাকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় সংসদকে কার্যকর রাখতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকবে, তবে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই দেশ অনেকবার হোঁচট খেয়েছে।
আজ আবার আমাদের সামনে দেশ গঠনের সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ যেন আমরা না হারাই। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আগে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যেভাবে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতাম এখন সেভাবে বলতে পারি না। কারণ আমি শপথ নিয়েছি, আমি সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করব ও কথা বলব।’
সিলেটে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাসের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর কোথাও নেই। সম্প্রীতির এই ঐতিহ্য অটুট রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সিলেট আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা। যখনই সুযোগ পাই সিলেটে আসি। সিলেটে যতবার এসেছি, ততবারই উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছি। আমাদের চরম দুঃসময়েও সিলেটবাসী পাশে ছিলেন। সিলেটের মানুষের সঙ্গে অতীতে ছিলাম, ইনশাআল্লাহ আগামীতেও থাকব।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সিলেট অত্যন্ত গৌরবময় একটি অঞ্চল। এখানে হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরান (রহ.) শুয়ে আছেন। শ্রীচৈতন্য দেবের স্মৃতিবিজড়িত সিলেট। এখানে হাছন রাজা, রাধারমন, শীতালং শাহ, শাহ আবদুল করিমরা জন্ম নিয়েছেন। এমএজি ওসমানী, এম সাইফুর রহমান, এম এ খান, ইলিয়াস আলীর মতো নেতারা এই মাটির সন্তান। সিলেটের একটি আলাদা ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। সিলেটের চা বাগানের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। সিলেটের প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন। সিলেটের মানুষ যেমন শান্তিপ্রিয়, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সিলেটে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি সিলেটের পর্যটন খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমও উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকালে রাষ্ট্রপতি বিমানযোগে সিলেটে এসে পৌঁছেন। সিলেট পৌঁছে প্রথমেই তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। রাষ্ট্রপতির যাত্রাপথের বিভিন্ন মোড়ে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সমবেত হয়ে তাকে স্বাগত জানান। রাষ্ট্রপতির সফর উপলক্ষে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সিসিকের সংবর্ধনা বয়কট বিএনপির : রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্মানে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বয়কট করেছে মহানগর বিএনপি। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ অনেক নেতা অনুষ্ঠান বর্জন করে আয়োজকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, যথাযথ নিয়মে নাগরিক কমিটি গঠন না করে এক ব্যক্তির ইচ্ছেমতো অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটিকে নাগরিক সংবর্ধনা বলা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি কোনো নাগরিক কমিটি আয়োজিত সংবর্ধনা নয়। এটি সিসিকের অনুষ্ঠান এবং আয়োজনটি এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সিলেট বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাও অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাননি। তাই মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের সড়কের দুপাশে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান ও স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু সিসিক আয়োজিত অনুষ্ঠান বর্জন করে।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আয়োজনটি ছিল ব্যক্তির ইচ্ছা ও স্বেচ্ছাচারে ভরপুর। বিএনপির ত্যাগী ও শীর্ষ নেতারাও ঠিকমতো দাওয়াত পাননি। তাই আমরা সিসিকের ওই অনুষ্ঠান বর্জন করেছি।’
দলীয় সূত্র জানায়, অনুষ্ঠান বর্জনকারী নেতাদের মধ্যে ছিলেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিম, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী প্রমুখ। এ নিয়ে সিলেট বিএনপিতে এখন ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে।