আলো-ছায়ার গল্প

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ এএম

সকালের সূর্যকে পিঠ দেখিয়ে পলো হাতে দাঁড়িয়ে কয়েকটি কালো অবয়ব। পেছনের আকাশ এতটাই নির্মেদ যে মানুষগুলোকে মনে হয় কোনো এক প্রাচীন সময় থেকে উঠে আসা রেখাচিত্র। পলোর ফাঁক দিয়ে আলো দেখা গেলেও মানুষগুলোর মুখ গাঢ় ছায়ায় ঢাকা। তবু স্পষ্ট তাদের উপস্থিতি। মনে হয়, মানুষগুলো নয় তাদের ছায়াই যেন দাঁড়িয়ে আছে আলোর বিপরীতে, কোনো অদৃশ্য গল্পের অপেক্ষায়।

ছবি আঁকি আমরা আলো দিয়ে। কিন্তু সব গল্প আলোতেই বলতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আলো যখন নিজেকে গুটিয়ে নেয়, ছায়া হয়ে ওঠে গল্পের ভাষা। মুখের ভাষা সেখানে মুছে যায়, রয়ে যায় শুধু অবয়বের উচ্চারণ; রঙ নয়, রেখাই হয়ে ওঠে অনুভবের আলেখ্য। সিলুয়েট ফটোগ্রাফি সেই নীরব ভাষারই শিল্প, যেখানে বিষয়বস্তুকে অন্ধকারে রেখে আলোর বিপরীতে তার আকৃতি ও ভঙ্গিমাকেই গল্প বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কখনো ভোরের আকাশ, কখনো সূর্যাস্তের আলো আলোই সেখানে শিল্পীর প্রধান পটভূমি।

ছবিটির জন্ম ২০২১ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে, পলো বাওয়া উৎসবের দিনে। আমরা তিনজন আলোকচিত্রী গিয়েছিলাম উৎসবটির ছবি তুলতে। নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের মানুষ দল বেঁধে জলাশয়ে নামেন মাছ ধরতে কারও হাতে পলো, কারও হাতে মাছ ধরার অন্য সরঞ্জাম। জল, জীবন আর ঐতিহ্যের এই সম্মিলিত আয়োজন গ্রামীণ জীবনের এক প্রাণবন্ত অধ্যায়।

পানিতে নামার আগে কয়েকজন জেলে একটি উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ হয়তো গল্প করছিলেন, কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে পেছনে থাকা সূর্যের আলোয় তাদের অবয়বগুলো হঠাৎ আমার চোখে অন্য এক দৃশ্য হয়ে উঠল। মাথার ওপর পলোগুলো শুধু মাছ ধরার সরঞ্জাম বলে মনে হলো না; বরং বৃত্তাকার রেখাগুলো আকাশের বিপরীতে তৈরি করছিল অদ্ভুত এক জ্যামিতি। মানুষ আর পলো মিলিয়ে যেন তৈরি হচ্ছিল গ্রামবাংলার কোনো আদিম চিত্রলিপি। তখনই মনে হলো, এই দৃশ্যের সৌন্দর্য তার বিবরণে নয় বরং বিবরণ মুছে দিলেই হয়তো হয়ে উঠবে আরও গভীর।

আলোর বিপরীতে বিষয়বস্তুর সব অপ্রয়োজনীয় বিবরণ যখন গাঢ় ছায়ায় হারিয়ে যায়, অবয়ব তখন প্রধান চরিত্র হয়ে দর্শকের মনোযোগকে নিয়ে যায় রেখা ও ভঙ্গিমার ভেতর দিয়ে অস্তিত্ব আর অনুভূতির গভীরে। প্রত্যেক দর্শক নিজের মতো করে পড়ে নেন ছবির গল্প। সে গল্প কখনো একাকিত্বের, কখনো প্রেমের, কখনো অপেক্ষার, কখনো বা উচ্ছ্বাসের। তবে এই নান্দনিকতার পেছনে রয়েছে আলোর নির্দিষ্ট ব্যাকরণ। বিষয়বস্তুর পেছনে থাকা উজ্জ্বল আলোর উৎসই সিলুয়েট তৈরির মূল শর্ত তা হোক প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম। তবে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের আলো দৃশ্যের আবহকে করে তোলে নাটকীয়। ক্যামেরার এক্সপোজার নির্ধারণ করতে হয় উজ্জ্বল পটভূমিকে ভিত্তি করে, যাতে সামনের বিষয়বস্তু গভীর ছায়ায় ডুবে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার অবয়ব। প্রয়োজনে এক্সপোজার কিছুটা কমিয়ে নেওয়া যায়। তবে ক্যামেরা-কৌশলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবয়বের স্বাতন্ত্র্য, পরিচ্ছন্ন পটভূমি, দৃঢ় বিন্যাস এবং আলোর সঙ্গে সঠিক অবস্থান। কারণ সিলুয়েটে মুখের অভিব্যক্তি নেই; শরীরের ভঙ্গিই হয়ে ওঠে তার অভিব্যক্তি।

হয়তো এই কারণেই সিলুয়েটের মধ্যে জীবনেরও একটি গভীর ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। মানুষকে আমরা কত নামে, কত পরিচয়ে, কত বাহ্যিক বিবরণে চিনে নিই পেশা, পোশাক, অবস্থান, সামাজিক পরিচয়। অথচ পরিচয়ের সে সব আবরণ একে একে সরিয়ে নিলে যে অবয়বটি রয়ে যায়, সেটিই যেন মানুষের সবচেয়ে সরল উপস্থিতি। এই ছবির মানুষগুলোর মুখ আমরা দেখি না, জানি না তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়; তবু তারা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে একটি সম্পূর্ণ গল্প হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তারা যেন হয়ে ওঠেন শ্রম, ঐতিহ্য আর সমষ্টিগত জীবনের এক প্রতীকী অবয়ব।

ফটোগ্রাফি তাই সবসময় সবিস্তার প্রকাশের শিল্প নয়। মাঝেমধ্যে কিছু বিবরণ আড়ালে রাখতে হয়, কিছু মুখ মিলিয়ে দিতে হয় অন্ধকারে, যাতে দৃশ্যের ভেতর দর্শকের কল্পনার জন্য কিছুটা জায়গা তৈরি হয়। তখন ছবির গল্প আর শুধু ফটোগ্রাফারের থাকে না; দর্শকও ধীরে ধীরে তার সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। একটি অবয়বের দিকে তাকিয়ে তিনি সেখানে খুঁজতে থাকেন চেনা মানুষের ছায়া, নিজের কোনো স্মৃতি, কিংবা নিজেরই অজানা কোনো অনুভূতিকে।

সব গল্প যেমন শব্দে বোনা নয়, সব সৌন্দর্যও নয় আলোকোজ্জ্বল। কখনো একটি নিখুঁত ছায়াই হাজার রঙের চেয়ে বাঙময়, একটি নীরব অবয়বই হাজার শব্দের চেয়ে বাগ্মী। সেই কারণেই সিলুয়েট কেবল আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকার অবয়ব নয়। এটি আলো ও ছায়ার এক নীরব বোঝাপড়া, যার মধ্য দিয়ে আলো থেমে যায়, কিন্তু গল্প থামে না। বরং ছায়া তার নিজের ভাষায় লিখে ফেলে নতুন দৃশ্যগল্প।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত